শিরোনাম

বর্জ্যের ঢাকা থেকে বর্জ্য রফতানি

০২:০৭, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬

গরুর শিং থেকে শুরু করে হাড়, খুর, লেজ, ভুঁড়ি, বিশেষ অঙ্গ ইত্যাদি এখন হয়৷ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১৪০ কোটি টাকা৷

ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে এটি সম্ভব করেছেন৷ তাঁরা নিজেরাই বাজারের কথা জেনেছেন৷ আর সেখান থেকেই গরুর এ সব অংশ সঠিকভাবে প্রসেসিং, সংরক্ষণ ও রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ খুঁজে বের করেছেন৷

গরুর বর্জ্য ছাড়াও ঢাকা শহরে নানা ধরনের বর্জ্য রিসাইকেল করা হয়৷ বিশেষ করে প্লাষ্টিক বর্জ্য নিয়ে কাজ করে এমন অনেক কারখানা আছে৷ এর ওপর নির্ভর করে অনেক পরিবার টিকে আছে৷ ঢাকার বাইরে রান্নার কাজে মানুষের জৈবিক বর্জ্য দিয়ে উৎপাদিত বায়োগ্যাস ব্যবহার করা হয়৷ গবাদিপশু ও হাস মুরগির বিষ্ঠায় ক্ষুদ্র আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পও চালু আছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে৷

সাধারণভাবে বর্জ্যের উৎস হিসেবে তিনটি ক্ষেত্রকে বিবেচনায় নেয়া হয়:
১. গৃহ বর্জ্য
২. গৃহের বাইরে প্রতিষ্ঠান বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ও
৩. মেডিকেল বর্জ্য

গুণগত বিবেচনায় এই বর্জ্য মোটা দাগে দু'ধরনের:

১. তরল (লিকুইউ) ও
২. কঠিন (সলিড)

কী পরিমাণ বর্জ্য?
বাংলাদেশে বছরে শহরগুলোতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয় ২২.৪ মিলিয়ন টন অথবা বছরে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৫০ কেজি৷ ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৭,০৬৪ টন৷

দেশের মোট বর্জ্যের ৩৭ ভাগ উৎপাদিত হয় রাজধানী ঢাকায়৷ অথচ সেখানে বর্জ্যের কোনো পরিকল্পিত ব্যবহার নেই৷ এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেয়া৷ ইউএনএফপিএ-র মতে, ঢাকা যে সর্বাধিক দূষিত শহরের একটি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দূর্বলতা এর অন্যতম কারণ৷

রাজধানী ঢাকায় মোট বর্জ্যের ৭০ ভাগই সলিড বর্জ্য বলে মনে করা হয়৷ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন৷ তরল বা লিকুইড বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে ঢাকা ওয়াসা৷ ঢাকায় সর্বমোট ২,৫০০ কিলোমিটার খোলা ড্রেন এবং ৪,০০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ সিস্টেম রয়েছে৷ এ কাজ করার জন্য ৬৫ কিলোমিটার খোলা খাল ও বক্স কালভার্ট আছে৷ তরল বর্জ্য সাধারণত এসব ড্রেন ও বক্স কালভার্টের মাধ্যমে অপসারিত হয়৷

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে দিনে গড়ে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছয় হাজার টনের বেশি নয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে৷ বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষাও বলছে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে সাত হাজার মেট্রিক টনের মতো বর্জ্য উৎপাদিত হয়৷ ঢাকায় মাথাপিছু প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৫৬০ গ্রাম৷

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন ৬,১১০ টন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে৷ এর মধ্যে ঢাকার প্রত্যেক নাগরিক ৩৭৭ গ্রাম বর্জ্য উৎপাদন করে, যার ৯৭ শতাংশই জৈব পদার্থ৷ বাকি তিন শতাংশ বর্জ্য অজৈব৷ মেডিকেল এবং মেডিকেল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ১,০৫০ টন ও রাস্তাঘাট থেকে চারশ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়৷

বলা হয়ে থাকে ঢাকায় উৎপাদিত বর্জ্যের ৭৬ ভাগই রিসাইকেল যোগ্য৷ তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুরোটাই আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া হয়৷ ১০ বছর আগে দৈনিক ৩,২০০ টন বর্জ্য উৎপাদনের বিপরীতে ৪৩ শতাংশ হারে অপসারিত হতো ১,৩৭৬ টন৷ আর এখন দৈনিক ৬,১১০ টন বর্জ্য উৎপাদনের বিপরীতে অপসারিত হয় ৪,৫৮২ টন বর্জ্য৷ বৃষ্টিতে পানি জমলে কঠিন এবং তরল বর্জ্য একাকার হয়ে যায়৷ গত ১০ বছরে ঢাকায় বর্জ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ৷

বর্জ্য থেকে পণ্য উৎপাদনের চিন্তা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক কমোডর বখতিয়ার আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের কাছে কঠিন বর্জ্যের হিসাব আছে৷ আমরা বর্জ্য সংগ্রহ করে সরাসরি ডাম্পিং-এ পাঠিয়ে দিই৷ আমাদের ডেমরা এবং মাতুয়াইলে দু'টি ডাম্পিং স্টেশন আছে৷ বর্জ্য সংগ্রহ এবং ডাম্পিং-এর জন্য ৮ হাজার কর্মী আছে৷ আছে যানবাহন৷ আপাতত এর বাইরে আমাদের কিছু করণীয় নেই৷''

তিনি জানান, ‘‘বর্জ্য পরিবহণের জন্য আমরা বর্জ্য অনুযায়ী খোলা বা কাভার্ড ট্রাক ব্যবহার করি৷ মেডিকেল বর্জ্য খুবই সতর্কতার সঙ্গে পরিবহন করা হয়৷ আর ডাম্পিং এলাকাগুলোর আশপাশে কোনো লোকালয় নেই৷ তাই এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারেনা৷''

তবে বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি বর্জ্য দিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সার উৎপাদন করব৷ তখন বর্জ্য আর বর্জ্য থাকবে না৷ বর্জ্য হবে কাঁচামাল৷ তবে এইসব প্রকল্প করতে অনেক অর্থ এবং জমির প্রয়োজন৷ আশা করি আমরা সফল হবো৷''

তিনি জানান, ‘‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ বর্জ্য রিসাইকেল করছে৷ কেউ কেউ সেটাকে সরাসরি পণ্যে রূপান্তর করে রফতানি করছে৷ সিটি কর্পোরেশন এরকম কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করবে, আলোচনা চলছে৷'' ওয়েস্ট কনসার্ন নামে একটি এনজিও এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইকেলিং নিয়ে কাজ করছে৷

মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘কোন বর্জ্য ডাম্পিং করা যাবে আর কোনটা যাবে না সেটা জানা খুব জরুরি৷ কিছু কিছু মেডিকেল বর্জ্য আছে যা সরাসরি পুড়িয়ে ফেলতে হবে, ডাম্পিং করা যাবে না৷ আমাদের এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আসলে তেমন আধুনিক নয়৷ সিটি কর্পোরেশন সম্প্রতি মেডিকেল বর্জ্য নিয়ে প্রিজম নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে৷ এই প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিকর মেডিকেল বর্জ্য চিহ্নিত করে দিচ্ছে৷''

তিনি বলেন, ‘‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই অর্থে না থাকায় এখন বর্জ্যের মাধ্যমেই সংক্রামক ও অসংক্রামক দু'ধরনের রোগই ছড়াচ্ছে৷ বর্জ্যে থাকা নানা ধরনের জীবাণু পানির সঙ্গে মিশে, শুকিয়ে বাতাসে ভেসে এবং মাটি ও চারপাশকে দূষিত করে তা আবার ছড়িয়ে পড়ে৷''

ডাঃ লেলিন বলেন, ‘‘অথচ সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য মানুষের জন্য ঝুঁকি বাড়াবে না, এমনকি অর্থনীতির জন্য নতুন দরজা খুলে দেবে৷'' একই ধরনের কথা বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক বখতিয়ার আহমেদ৷ ‘‘উদ্যোগ নিতে পারলে সময় আসবে যখন বর্জ্য হবে পণ্য৷ কেউ বেঁচবেন, কেউ কিনবেন৷ তখন সেটা আর ফেলনা থাকবে না'', বলেন তিনি৷

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত