শিরোনাম

এক গাভি থেকে ৫০ গরুর মালিক

চাটমোরের গরু পালন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন
শিমুল বিশ্বাস, চাটমোহর (পাবনা)  |  ১৫:৫০, জুলাই ০৮, ২০১৯

গরু পালন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পাবনার চাটমোরের উপজেলার গুনাইগাছা ইউনিয়নের পৈলানপুর গ্রামের মৃত শমসের প্রামাণিকের ছেলে আলেপ হোসেন। তিনি বাড়িতে শখের বসে একটি গাভি পালন শুরু করে ছিলেন।

গত দশ বছরে একে একে আজ পঞ্চাশটি গাভির মালিক হয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে চাকরির পেছনে সময় না দিয়ে নিজেই হয়েছেন একজন সফল উদ্যোক্তা। এক সময়ের বেকার ও হাতাশ জীবন অতিবাহিত করে আজ তিনি স্বাবলম্বী। গরু পালন করে আজ তার পাকা ঘর, জায়গা জমিসহ পরিবারে অনেক কিছুই করেছেন। তার আয়ের প্রধান অবলম্বন গরুগুলোকে সযত্নে লালন পালনের পাশাপাশি  দিয়েছেন আদরের নানা নাম।

সরেজমিন গরুর খামার মালিক আলেপের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আলেপ তার বাড়ির পাশের জমিতে রোপণ করা কাঁচা ঘাস কেটে আনছেন। সেই ঘাস বাড়িতে আনার পরে কাচি দিয়ে কেটে গরুগুলোর খাবার উপযোগী করছেন। আর এই কাজে তাকে সহায়তা করছেন তার স্ত্রী শিল্পীয়ারা পারভীন।

একটা গাভি থেকে পঞ্চাশটি গরুর মালিক হওয়া এমএ পাশ করে উনচল্লিশ বছর বয়সে তার সফলতা প্রসঙ্গে বলেন, ২০০৭ সালে পাবনার এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে এম এ ডিগ্রী অর্জন করার পর বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, সৌর বিদ্যুৎ বিপণন ও গার্মেন্টস এ কিছুদিন কাজ করি।

এসকল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে ভাল না লাগায় বাড়ি ফিরে গরুর খামার করার স্বপ্ন দেখি। এমন সময় বাবা আমাদের পৃথক করে দেন। পৈত্রিক সংসারের ভাগ বাটোয়ারায় আমি একটি দুগ্ধবতী গাভি পাই। তখন বাড়ি বাড়ি থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে মানুষের গাভির দুধ কিনে ও আমার গাভির দুধ ব্রাকের স্থানীয় চিলিং সেন্টারে বিক্রি শুরু করি। ভালই লাভ হতে থাকে। এর পর ৮২ হাজার টাকা দিয়ে আরেকটি গাভি কিনি।

এ গাভীটিও প্রতিদিন প্রায় ৩০ লিটার দুধ দিতে থাকে। এটি ২০০৯ সালের কথা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাভীর সংখ্যা। এঁড়ে বাছুর গুলো বড় করে বিক্রি করি আর বকনা বাছুরগুলো পালন করতে থাকি। দশ বছরের মাথায় আমার খামারে গাভি ও বাছুরের সংখ্যা প্রায় ৫০ এ এসে দাঁড়িয়েছে।

এর মধ্যে কয়েকদিন পূর্বে সাতটি সহ এ পর্যন্ত অনেক ষাঁড়, গাভি বিক্রি করে প্রায় সাত বিঘা জমি কিনেছি। দশ বছর পূর্বে আমার একটা মাত্র টিনের ঘর ছিল। এখন তিন তলা ভিত দিয়ে চার রুমের ছাদওয়ালা বাড়ি করেছি। সব মিলিয়ে এখন আমি অনেক ভাল আছি।

আলেপ আরো বলেন, এর জন্য আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এখনো প্রতিদিন সকালে উঠে গরুগুলোর পরিচর্যা করি, দুই বার দুধ দোহন করি, গরুগুলোকে গোসল করাই, পানীয় পরিবেশন করি এবং আমাদের গ্রামে অবস্থিত ব্র্যাকের চিলিং সেন্টারে দুধ দিতে যাই।

এখন আমি আমার গাভি গুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২শ লিটার দুধ পাচ্ছি। এসব কাজে সহযোগিতার জন্য দুই জন মানুষ রাখা আছে। তারা ঘাস বোনা কাটাসহ অন্যান্য কাজে আমাকে সহায়তা করে। তাদের মাসে দশ হাজার টাকা করে বেতন দেই। বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছি। গমের ভূষি, ভুট্টার গুড়া, নাড়িকেলের খৈলসহ গরুর অন্যান্য খাদ্য বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

এ ছাড়া অন্যান্য খরচ তো আছেই। এলাকার অনেক খামারী এখন আমার কাছে পরামর্শ নিতে আসে। রোগ ব্যাথি সম্পর্কে তিনি বলেন, গাভীর ওলান ফোলা ও ক্ষুরা রোগ বেশি হয়। তবে বড় গাভীগুলোর শরীরের মধ্যে বোলাস ঢুকিয়ে দেয়া আছে।

সূর্যমুখী প্রাণী সম্পদ কর্তৃপক্ষ ঢাকা থেকেই গাভিগুলো মনিটরিং করেন। যখন কোন অসুখ বিসুখে আক্রান্ত হয় তখন তারা আমার মোবাইলে মেসেজ দেয়। আমি ব্র্যাকের চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হই। তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেন। খামারের কাজে আমার স্ত্রী সার্বক্ষণিক ভাবে আমাকে সহায়তা করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মহির উদ্দিন বলেন, গরু পালন শুরু করলে অবশ্যই সফলতার দেখা পাওয়া যায়। কেউ উদ্যোক্তা হয়ে খামারী হতে চাইলে যতটুকু সম্ভব উপজেলা অফিস থেকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হবে।

এমআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত