শিরোনাম

বাসের মতো বিমান চাই!

রোকন রাইয়ান।। প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১০:৫০, জুলাই ০৪, ২০১৯

ওমরাহ থেকে ছোট মামা ফিরছেন। সাথে নানি। রিসিভ করতে বিমানবন্দরে গেলাম। রাত ১১ টায় নামার কথা। একটু আগেই পৌঁছলাম। বিমান ল্যান্ড করেছে ১১ টা ২০ এ।

মামাকে ফোন দিলাম। রিসিভ করলেন। বললেন বিমান থেকে নামছি। বললাম আধঘন্টার মধ্যেই তো বের হতে পারবেন তাই না? বললেন দেখা যাক কতক্ষণ লাগে।

আমার ভেতর তাড়া ছিল। বিমানবন্দর থেকে মুগদা। দেড় দুই ঘণ্টার পথ। দ্রুত ফিরতে হবে। সকাল সকাল অফিস। না ঘুমাতে পারলে অফিস মাটি। দোয়া কালাম পড়ছিলাম দ্রুত যেন ইমিগ্রেশন পার হয়ে বেরুতে পারেন।

কিন্তু এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও ফেরার নাম নেই। গ্রাম থেকে বড় মামা আর খালু এসেছেন। আমরা ক্যানোপি-২ এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একের পর এক মানুষ আসছে ভেতর থেকে। ফুল জুব্বা-কালো বোরকার হিজাবি মানুষ। হাফ প্যান্ট পরা সাদা চামড়ার মানুষ। কিন্তু আমাদের অপেক্ষা ফুরোচ্ছে না।

এক সময় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। ফোন দিলাম। মামা বললেন বিমান থেকে তো আগেই নেমেছি। কিন্তু লাগেজ এখনো পাইনি। আরেকটু সময় লাগবে।

আশপাশে আরও বহু অস্থির মানুষ। সবাই হাসফাস করছেন। কার কাঙ্ক্ষিত মানুষ কখন আসবে। সেই আগ্রহ অনেকের ফুরোচ্ছে। তাদের মুখে হাসি ফুটতে দেখা যাচ্ছে। কারও অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। তাদের মুখে হতাশা।

এরই মধ্যে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে আড়াই ঘণ্টাও পার হতে চলল। কিন্তু মামার দেখা নাই। অধীর হয়ে ফের ফোন দিলাম। মামা বললেন, ঝামেলা হয়ে গেছে।

আমাদের অনেক যাত্রীর লাগেজ রিয়াদ বিমানবন্দর থেকে নাকি বিমানে তোলাই হয়নি! সেগুলো সেখানেই রয়ে গেছে! প্রায় ৭০ জনের মতো মানুষ আটকে আছে। সবার লাগেজ রিয়াদেই।

কথা শুনে মাথায় আকাশ ভাঙল। যারা বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপুর্ণ জায়গায় কাজ করেন তারা এত ভুলোমনা হয় কি করে? এত অব্যবস্থাপনা থাকে কিভাবে? এরা কি কখনো ভুলে প্যান্ট ছাড়া শুধু শার্ট পরে অফিসে চলে আসে? আসে হয়তো।

যাক তারা শুধু শার্ট পরে আসুক বা জন্মদিনের পোশাকে এ নিয়ে আপাতত চিন্তা নেই। চিন্তা হলো এই লাগেজ কি তারা ফিরে পাবেন? পেলে কখন?

নাকি লাগেজের আশা ছেড়ে দিতে হবে? একটা শোরগোল শুরু হয়ে গেছে ক্যানোপির সামনে অপেক্ষমান মানুষগুলোর মধ্যে। কোথায় দ্রুত বাড়ি ফিরবে সেখানে এসে ভর করলো লাগেজ খোয়ানোর চিন্তা।

আমি এর মধ্যে গুগল সার্চ শুরু করলাম। বিমানবন্দরে সমস্যা লিখে। সেখানে অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় সামনে এলো।

গত ঈদের আগেই প্রধানমন্ত্রীর বিমানের এক পাইলট ভুলে পাসপোর্ট রেখে গিয়েছিলেন। বিমানটি আটকে দিয়েছিলো কাতার ইমিগ্রেশন। এ নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি।

বড় যে ব্যাপারটি সামনে এলো সেটি হলো একটা জরিপে দেখা গেছে, বছরে নাকি আড়াই কোটি লাগেজ উধাও হয়ে যায় বিমানবন্দর থেকে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ডিভাইসও এসব ঠেকাতে পারছে না।

লাগেজ উধাও ছাড়াও আরও নানারকম কাহিনী হয় বিমানবন্দরে। ঈদের ছুটিতে একটি বিমান ভোর চারটায় ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছেড়েছে বিকাল ৩ টায়। এ নিয়ে যাত্রীরা অধীর হয়ে ভাঙচুরও করেছেন ভেতরে।

কিছুদিন আগেই অস্ত্রসহ ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন সাবেক অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। বিমানবন্দরের উন্নত স্ক্যানিং মেশিন সেটি টেরও পায়নি।

তথ্যগুলো সামনে আসায় সুবিধে হলো। আমার টেনশন কিছুটা কমলো। লাগেজ হারানোর রহস্য তাহলে নতুন নয়।

কিছুক্ষণ পর একটা শোরগোল দেখে এগিয়ে গেলাম। তাদের যাত্রীর লাগেজও নাকি গায়েব। একজন খুব রুক্ষ গলায় হাক-ডাক করছেন।

তার বক্তব্য, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া যাত্রীর লাগেজ তুলতে কিভাবে ভুল হয় কর্মকর্তাদের। এমন ভুলই যদি করে তাহলে যাত্রীদের নিজ দায়িত্বে লাগেজ বহনের আইন দরকার।

পাশ থেকে আরেকজন বলে বসলেন- ‘বাসের মতো বিমান’ দরকার, যাতে যাত্রীরা নিজের জিনিস নিজের সুবিধামতো বহন করতে পারে।

তার কথায় দেখলাম কয়েকজন বেশ মজা পেল। এবং দাবিটা যৌক্তিক এমন ভঙ্গিতেও কয়েকজন সমর্থন দিলো। আমিও মনে মনে আওড়ালাম- বাসের মতো বিমান। চিন্তাটা খারাপ না। কর্মকর্তাদের ভুলে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এভাবে গায়েব হবে তা তো মানা যায় না।

মামা আর নানি ফিরে এলেন আরও ঘণ্টাখানেক পর। জানালেন বিমানবন্দরে এরকম ঘটনা মাঝে মাঝেই হয়। তারা আর লাগেজ ফেরত পান না। তবে একসঙ্গে ৭০ জনের মতো যাত্রীর লাগেজ আটকে যাওয়ায় এবং ভেতরে সবাই প্রতিবাদ করায় তারা চাপে পড়েছেন। বলছেন দুয়েকদিনের মধ্যে লাগেজ ফেরত আনার ব্যবস্থা করবে।

ছোটমামার সাথে লাগেজ ছিল চারটি। সাথে মুয়াল্লিম দিয়ে দিয়েছিলেন আরও চারটি। এসব বহন করার জন্য বড় মামা এলাকা থেকে গাড়ি ভাড়া করে এনেছিলেন। সেই গাড়িতে তারাই ফিরলেন।

ছোট মামা থেকে গেলেন ঢাকায়। লাগেজগুলো কখন আবার এসে যায়- আসলে আবার ‘এনারা গায়েব করে না ফেলে’ এসব টেনশনেই বাকি রাত কাটলো আমাদের।

লিখেছেন : রোকন রাইয়ান

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত