শিরোনাম

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ৭০ বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত সেই কৃষ্ণাঙ্গ শিশু

সুলাইমান সাদী  |  ১৬:০২, মে ২৯, ২০১৯

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ৭০ বছর পর নিরপরাধ প্রমাণিত সেই কৃষ্ণাঙ্গ শিশু
দেহের তুলনায় চেয়ার অনেক বড় ছিল। হাত-পা বাঁধা। তবু ঢিলেঢালা লাগছে। মাথায় ইস্পাতের টুপিও ফিট খাচ্ছিল না।

মাথাটা জায়গা মতো উঠছিল না। একটি বাইবেলের ওপর বসানো হলো শিশুটিকে। চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছিল পট্টিটাও। অবশেষে একটা ইশারা এলো। পতাকা নামানোর শব্দ হলো। মৃদু চিৎকার ভাসল বাতাসে। দেহ ছটফটাতে ছটফটাতে ঘাড়টা একদিকে হেলে পড়ল। এভাবেই পাড়ি জমাল এক নিরপরাধ শিশুর প্রাণ।

কোনো সাধারণ চেয়ার ছিল না সেটা। কারেন্টের এ চেয়ারটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। চব্বিশশ ওয়ার্ডের আঘাত চোখ বুজতেই রগে রগে ছড়িয়ে পড়ত।

ইংরেজি গণমাধ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট মতে এটি আমেরিকার একটি সত্য ঘটনা। সাজাপ্রাপ্ত ছিল চৌদ্দ বছরের এক শিশু। তার অপরাধ ছিল নিছক গায়ের রঙ কালো হওয়া।

এমন একটি কেইস ছিল এটি, আজও আমেরিকার চিন্তারাজ্যে ঘাম ঝরিয়ে ছাড়ছে। দ্বিতীয়বার এ কেইসের ফাইল যখন খোলা হলো তখন একবার দশ মিনিট, আরেকবার সত্তর বছর কেইসটি লাগাতার চলতে থাকল। অবশেষে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই শিশু নিরপরাধ প্রমাণিত হলো।

ঘটনাটি ঘটেছিল আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ক্যারোলিনার এ্যালকোলোকায়। সময়টি ছিল ১৯৪৪ সাল।

জর্জ স্ট্যানে নামের আফ্রিকান বংশোদ্ভুত মার্কিন শিশুটি তার পরিবারের সঙ্গে এমন একটি এলাকায় থাকত যেটা কালো চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্দিষ্ট করা ছিল। সাদা চামড়ার শ্বেতাঙ্গদের আবাস ছিল রেললাইনে অপরপাড়ে।

কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মেলামেষা নিষিদ্ধ ছিল ওই এলাকায়। কিন্তু বাচ্চাদের কি এতোসব নিষেধ-মানা বুঝে আসে? দুই শ্বেতাঙ্গ শিশু সাত বছরের জুন বেনিকর ও দশ বছরের মেরি ইমা তাদের সাইকেল নিয়ে জর্জ ও তার সাত বছরের বোন এমির পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলল, আমরা ফুল তুলতে যাই।

এরপর ওই দুই শিশু উধাও হয়ে যায়। তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে সবাই। জর্জের পিতাও তাদের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। কিন্তু শিশুদুটোর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। রাত পোহাতেই তাদের লাশ পাওয়া যায়। তাদেরকে ইস্পাতের আঘাতে হত্যা করে নালায় ফেলে দেয়া হয়।

এ ঘটনায় এলাকার শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিশু দুটো জর্জের সঙ্গে কথা বলার সাক্ষীও এসে পড়ে। পুলিশ জর্জকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের বক্তব্য মতে জর্জ তার অপরাধ শিকার করেছিল। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তারা কৃষ্ণাঙ্গদের ঘরবাড়িতে আক্রমণ চালায়। কৃষ্ণাঙ্গরা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

তেরো দিনের মাথায় আইনি এ্যাকশনের পর কেইস আদালতে ওঠে। পুলিশ সদস্যদের থেকে নিয়ে আদালতের জজ সবাই ছিল শ্বেতাঙ্গ। আদালত মাত্র দশমিনিটের শুনানির পর কৃষ্ণাঙ্গ শিশুটির মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে দেয়। দৃশ্যত ঘটনা এখানে শেষ হলেও এর জের ধরে ইতিহাস আরো অনেকদূর এগিয়ে যায়।

এ রায়ের পর শিশু জর্জকে বন্দিশালায় রাখা হয়। বেশ  কিছু বছর পর স্ট্যানের পরিবার দ্বিতীয়বার ট্রায়ালের জন্য আবেদন করেন। তদন্ত শুরু হলে স্পষ্ট হতে লাগল, জর্জ ন্যায় বিচার পায়নি। তৎকালীন বর্ণবাদী আইনের কারণে শ্বেতাঙ্গদের মোকাবেলায় জর্জ একটি সহজ বলিতে পরিণত হয়েছিল। পুলিশও তখন তাকে গ্রেপ্তার করে নিছক দায়িত্বের বোঝা নামিয়েছিল কাঁধ থেকে।

২০০৪ সালে জোরালো তদন্তের মাধ্যমে কেইসে এমন কিছু ত্রুটি ধরা পড়ল, যার দ্বারা জর্জের পক্ষে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়। হতে পারে তার বিরুদ্ধে চাক্ষুস কোনো সাক্ষী ছিল না অথবা হত্যার হাতিয়ার পাওয়া যায়নি তখন। এমনকি একটি চৌদ্দ বছরের শিশুর পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না, সে দুটো শিশুকে হত্যা করে টানতে টানতে নালা পর্যন্ত নিয়ে যাবে, অথচ তার কাপড়ে কোনো দাগ থাকবে না।

এ কেইসের সব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৪ সালে এক নারী জজ কেয়ার মোন্টি মুলান তার রায়ের কপিতে লেখেন, জর্জের সঙ্গে বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। এ কেইসে ভয়ানক ত্রুটি ধরা পড়েছে। ওই শিশুর ওপর হত্যার দায় কোনোভাবেই চাপানো যায় না। এ কেইসে ন্যায়পূর্ণ কোনো ট্রায়েল চালানো হয়নি। আসামী পক্ষকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়নি। এ জন্য আজ ২০১৪ সালে এসে ১৯৪৪ সালের সেই রায়কে রহিত ঘোষণা করা হচ্ছে।

জজ মুলানের সেই রায় শোনার জন্য ১৯৪৪ সালের একজন লোকও সেখানে উপস্থিত ছিল না। কিন্তু শুনেছে বর্তমান পৃথিবীর দাপটশালী সুপার পাওয়ার আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ। শুনেছে বিশ্ব সভ্যতার সবগুলো ধ্বংসস্তুপ। শুনছি আমরাও।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে জর্জ স্ট্যানের জীবনের ওপর একটি মুভিও করা হয়। মুভিটির নাম ‘এইট্টি থ্রি ডেইস’। জর্জ আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী ছিল।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত