শিরোনাম

সবচেয়ে সুখী দেশে ইসলাম

প্রিন্ট সংস্করণ॥আমার সংবাদ ডেস্ক  |  ০০:৩০, মার্চ ২৩, ২০১৯

‘হাজার হ্রদের দেশ’ হিসেবে বিখ্যাত ফিনল্যান্ড। বাল্টিক সাগর-উপকূলের দেশটির অবস্থান ইউরোপের সর্ব উত্তরে। ফিনল্যান্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সুমেরুবৃত্তে অবস্থিত। ১৯৯৫ সালে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ হলো— দীর্ঘায়ত বনভূমি। এগুলোকে ফিনল্যান্ডের ‘সবুজ সোনা’ বলা হয়। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ফিনল্যান্ড কৃষিপ্রধান দেশ ছিল। সে হিসেবে বলা যায়, ফিনল্যান্ডে শিল্পায়ন কিছুটা দেরিতেই হয়েছে। পরবর্তীতে শিল্পোন্নয়নে অগ্রগতি পেয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয় এটি। ঘন সবুজারণ্য ও স্বচ্ছ জলের স্রোতস্বিনীতে নয়নাভিরাম ফিনল্যান্ড। প্রাচীরঘেরা প্রাসাদ ও অত্যাধুনিক দালানকোঠার গভীর মিতালি দেখা যায় এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ফিনল্যান্ডের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হেলসিঙ্কি। সমপ্রতি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টের জরিপ অনুযায়ী, ফিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য দেশ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার স্বীকৃতি পেয়েছে। ফিনল্যান্ডের জাতীয় ক্রিকেট দলে নুরুল হুদা স্বপন ও তন্ময় নামে দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা এখন ক্রিকেট মাঠে ফিনিশদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।আয়তন ও জনসংখ্যাফিনল্যান্ডের এক-দশমাংশই জলাশয় আর দুই-তৃতীয়াংশ হচ্ছে বনভূমি। আয়তন ৩ লাখ ৩৮ হাজার ১৪৫ বর্গ কিলোমিটার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী- (জুলাই ২০১৮) জনসংখ্যা ৫৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৪ জন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন জনসংখ্যার দিক দিয়ে ফিনল্যান্ডের অবস্থান তৃতীয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে মাত্র ১৬ জন মানুষ বসবাস করে। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনল্যান্ডে মুসলমানের সংখ্যা লাখেরও বেশি। এদের বেশিরভাগ অভিবাসী। তবে স্থানীয় ও ফিনিশ মুসলমানের সংখ্যাও রয়েছে বেশ।

স্বাধীনতা ও ভাষা : ফিনল্যান্ড ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সোস্যালিস্ট রিপাবলিক থেকে স্বাধীনতা লাভ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় সুইডেনের শাসনাধীন ছিল দেশটি। সেজন্য ফিনিশদের সংস্কৃতিতে সুইডিশ ও রুশ প্রভাব রয়েছে। দাপ্তরিক ভাষা ফিনিশ (৮৭%) ও সুইডিশ (৫.২%)।

ফিনল্যান্ডে ইসলামের আগমন : ফিনল্যান্ডে সর্বপ্রথম ইসলামের আগমন ঘটে ১৮০৯ সালে। তখন কিছু তাতার মুসলিম সৈনিক ও ব্যবসায়ী হিসেবে ফিনল্যান্ডে পা রাখে। তাদের নেতৃত্বে ১৮৩০ সালে ফিনল্যান্ডে প্রথম মুসলিম সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১৭ সালে রাশিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার পর সেই মুসলিমরা ফিনল্যান্ডে থেকে যায়। পরে ধারাবাহিকভাবে যুগোশ্লাভিয়া, মধ্য এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে থেকে মুসলমানরা ফিনল্যান্ডে বসবাস করতে শুরু করে। ১৯২৫ সালে ফিনল্যান্ডের মুসলিমরা সাইয়েদ উমর আবদুর রহিমের নেতৃত্বে সরকারের কাছে স্বীকৃতি চায়। সে বছরই দেশের সরকার ইসলাম ধর্মকে স্বীকৃতি দেয়।১৯৭১ সালে সে দেশে মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার জনের মতো। কিন্তু এরপর ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে সংখ্যা। মুসলমানদের সংখ্যা অন্য ধর্মাবলম্বী ও ধর্মহীনদের তুলনায় কম হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনাচার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক বন্ধন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে মুগ্ধ হয়ে বহু ফিনিশ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর ইসলাম গ্রহণকারী ফিনিশদের সংখ্যা গড়ে এক হাজার। এদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি। তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম পুরুষদের বিয়ে করে সংসার গড়ছে।

মুসলিমরা যেসব শহরে থাকে : ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে মুসলমানদের বসবাস। তবে রাজধানী হেলসিঙ্কিতেই থাকে বেশিরভাগ। এছাড়াও তামপেরে, ব্রুম্বাগ, তুর্কু, কুতা, পারভিনা ইত্যাদি শহরে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে। এদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত শ্রেণির।

মসজিদ ও নামাজঘর : ধর্মচর্চা ও ইবাদত-বন্দেগির জন্য ফিনল্যান্ডের মুসলমানরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার নির্মাণ করেছেন। মুসলিম সংগঠনগুলোর ব্যবস্থাপনায় রাজধানী হেলসিঙ্কি, তামপেরে, তুর্কু, অউলু, জাইভাসকিলা, লাহতি প্রভৃতি অঞ্চলে অনেকগুলো মসজিদ রয়েছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ও বাসাবাড়িতে সম্মিলিত নামাজঘর রয়েছে (পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার স্থান)।১৯৪০ দশকের গোড়ার দিকে ইয়ারভেনপা শহরে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহযোগিতায় এটির নির্মাণ খরচ বহন করা হয়। সর্বশেষ ২০০৯ সালে এ মসজিদটির সংস্কার হয়। হেলসিঙ্কিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মসজিদ ও দারুল আমান মসজিদ নামে দুটি মসজিদ পরিচালিত হয়। মসজিদ দুটির সার্বিক কার্যক্রম চলে ভাড়া করা ভবনে।

মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম : ফিনল্যান্ডে মসজিদকেন্দ্রিক দাওয়াতি কার্যক্রম ও ত?ৎপরতা পরিচালিত হয়। অধিকাংশ মসজিদের আওতাধীন পাঠাগার, কমিউনিটি হল, পবিত্র কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। দুই-চারটি মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।

মুসলিম সংগঠন ও সংস্থা : ফিনল্যান্ডের মুসলিমরা আধুনিক ইসলামী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে প্রথম ১৯৫২ সালে। এর নাম ফিনিশ ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন। অন্যদিকে আরব বংশোদ্ভূত মুসলমানদের মাধ্যমে পরিচালিত সংগঠন ‘ইসলামিক সোসাইটি অব ফিনল্যান্ড’ও রয়েছে। ১৯৮৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া মুসলিমরা হেলসিঙ্কিতে ইসলামিক সেন্টার ও যুব ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠা করেছে। মসজিদ, শিশুদের স্কুল, দেশি অনুষ্ঠানের ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আলাদা আলাদা কনভেনশন সেন্টার, পাঠাগার ও অভ্যর্থনাকেন্দ্র ইত্যাদি ইসলামিক সেন্টারের আওতাধীন রয়েছে। তারা ফিনল্যান্ডের ভাষায় পবিত্র কোরআনও অনুবাদ করেছে।রাজধানী ছাড়াও তামপেরে, তুর্কু, ব্রুম্বাগ, কুটা ও প্যারভিনা ইত্যাদি শহরে ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। তবে হেলসিঙ্কি ও তামপেরের ইসলামী সংস্থা দুটিই সবচেয়ে বড়। উভয়টির মাঝে দারুণ সমন্বয় ও বোঝাপড়া রয়েছে। সবগুলো সংস্থা ও সেন্টার একসঙ্গে মিলে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো করে থাকে।

বাধা নেই মসজিদ ও ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণে :বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ধর্মচর্চা, ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ ও ধর্ম প্রচারের সুযোগ রয়েছে ফিনল্যান্ডে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। পৃথিবীর সর্ববৃহ?ৎ এভানজেলিক্যাল লুথেরান গির্জা এখানেই অবস্থিত। অবশ্য দেশের শতকরা ২০ ভাগ মানুষের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই।
হিজাব পরতেও নেই প্রতিবন্ধকতা : হিজাব পরার ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। হেলসিঙ্কির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ে, পথঘাট ও শপিংসেন্টারে ইসলামী পোশাকে মেয়েদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়। স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেও মুসলমানদের রয়েছে চমৎকার সম্পর্ক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফিনল্যান্ড সরকার ইউরোপের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি মুসলিমবান্ধব।

মুসলিম শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা : ফিনল্যান্ডের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেন পারিবারিকভাবে। মসজিদকেন্দ্রিকও প্রয়োজনীয় ধর্মশিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। স্কুলপর্যায়েও ইসলাম-শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো বিদ্যালয়ে যদি মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে তাহলে সরকারি অনুমতিক্রমে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতি শিক্ষার ব্যবস্থার সুযোগ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের ১১টি মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর ছেলে-মেয়েদের ধর্মশিক্ষার জন্য সরকার অনুমোদিত পৃথক পাঠক্রম রয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবদীক্ষিত ফিনিশ মেয়েরা। দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি স্কুলে ইসলাম-শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতি বছর পাঠ্যবই বের করে। অন্যদিকে হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ রয়েছে। এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের স্নাতক, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রিও দেওয়া হয়। সবকিছু বিবেচনায় মুসলিমবান্ধব দেশ ফিনল্যান্ডে মুসলমানরা বেশ শান্তিতে আছেন। নারী-পুরুষ সবাই ধর্মানুরাগী। আচরণে ও উচ্চারণে অত্যন্ত মার্জিত ও রুচিশীল এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত