ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, ভোট ১১ মার্চ

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১১:৩৪, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

 

আগামী ১১ মার্চেই হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। সোমবার (১১ফেব্রুয়ারি)সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন নির্বাচন পরিচালনায় নিযুক্ত প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক এসএম মাহফুজুর রহমান। সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের সম্মেলনকক্ষে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এসময় অন্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর প্রাধ্যক্ষ, প্রক্টর ও নির্বাচন পরিচালনায় নিযুক্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন, ডাকসু নির্বাচন ঘিরে গঠিত বিভিন্ন কমিটির সদস্যরাও৷ মনোনয়ন বিতরণ ১৯-২৫ ফেব্রুয়ারি, মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার শেষ সময় ২ মার্চ। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ৩ মার্চ। আর নিজ নিজ হলে অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ।

এখন থেকে ২৮ বছর পূর্বে ১৯৯০ সালের ৬ জুন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর দীর্ঘ এ সময়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কমিটির নির্বাচন হলেও অধরাই থেকে যায় দেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্টখ্যাত ডাকসু নির্বাচন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন সময় দাবি উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। তবে সম্প্রতি আদালতের আদেশে অনেকটা নিরূপায় হয়েই ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৪ সালে। ১৯৫৩ সালের আগ পর্যন্ত ডাকসুর সহ-সভাপতি বা ভিপি মনোনয়ন করা হতো। ১৯৫৩ সালে ডাকসুর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৭ বছরে মাত্র ৭ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে ডাকসু নির্বাচন।স্বাধীনতার আগে শুধু ১৯৬৫-৬৬ ও ১৯৬৯-৭০ সালে এ নির্বাচন হয়নি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের শুরুতেই ১৯৭২-৭৩ সেশনে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালেও নির্বাচন দেওয়া হয়েছিল, তবে সেটা পণ্ড হয়ে যায়। এর পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে দুবার ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়া পরবর্তী আবদুস সাত্তার সরকারের আমলে একবার ১৯৮২-৮৩ সালে এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে দুবার ১৯৮৯-৯০ ও ১৯৯০-৯১ সেশনে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর গত ২৮ বছরে আর এই নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

একাধিকবার তফসিল ঘোষণা হলেও হয়নি নির্বাচন
১৯৯০ সালের পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৯১, ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালে তফসিল ঘোষণা করে প্রশাসন। এমনকি ঘোষণাও করা হয় নিবার্চনের তারিখ। কিন্তু কিছু সহিংস ঘটনা, সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা ও ছাত্র সংগঠনের বিরোধিতা ইত্যাদি কারণে শেষ পর্যন্ত আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনডাকসু নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারই ধারবাহিকতায় ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ’ থেকে বিক্ষোভ, ধমর্ঘট, কালো পতাকা মিছিল করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আদালতে মামলার কারণে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে এ দাবি আবার সামনে আসে। ওই বছরের ২৯ জুলাই ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়া উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। যা ঢাবি প্রশাসনকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলে। এছাড়া গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ওয়ালিদ আশরাফ নির্বাচনের জন্য ১৫ দিন অনশন করে।

আচার্যও চেয়েছেন নির্বাচন
২০১৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তাগাদা দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ আ মাস্ট। নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব শূন্যতার সৃষ্টি হবে।’ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, রাষ্ট্রপতির নির্দেশ এবং আদালতের চাপের মুখে ২০১৮ সালে এসে বতর্মান উপাচার্য ২০১৯ সালের মাচের্র মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়।

অসহযোগিতা ছিলো ছাত্র সংগঠনগুলোরও
ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে বিভিন্ন সময় আন্দোলন হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অসহযোগিতা ছিলো বৃহত্তর দুই ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের। ১৯৯১ সালের ১৮ জুন ডাকসু নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য মনিরুজ্জামান মিঞা নির্বাচন বন্ধ করে দেন। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে পরপর দুবার উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তখন ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণে নির্বাচন হয়নি। অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী উপাচার্য হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তখন ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন অসহযোগিতা করে। ২০০৫ সালের মে মাসে উপাচার্য এসএমএ ফায়েজ ওই বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তখন ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে একাধিকবার মিছিল, সমাবেশ ও উপাচার্যকে স্মারকলিপি দেয়। কিন্তু বিরোধিতা করে ছাত্রলীগ।