শিরোনাম

জাবিতে শিফট ভিত্তিক পরীক্ষায় মেধার অবমূল্যায়ন

ইমন মাহমুদ, জাবি  |  ১২:২০, অক্টোবর ১১, ২০১৮

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও ২০১৮-১৯ শিক্ষাবষের্র স্নাতক সম্মান শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা ‘বিতর্কিত’ শিফট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের। যার প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন অনুষদের শিফট ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণ করে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি আসনের বিপরীতে ১০গুণ করে ছেলে ও মেয়েদের আলাদাভাবে মেধা তালিকা প্রকাশ করে থাকে। গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদভুক্ত ‘এ ইউনিটের’ ৮টি শিফটে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ছেলেদের ২৩৫টি এবং মেয়েদের ১৭৫টি আসনের বিপরীতে ১০গুণ শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশ করা হয়েছে। ছাত্র ও ছাত্রীদের শীর্ষ ১০০ জনের তালিকায় ২য় শিফট থেকেই এসেছে ৪৭জন ছাত্র। আর দ্বিতীয় দিনের ৩য় শিফট থেকে মাত্র ১জন। বাকি ছয় শিফট মিলিয়ে এসেছে ৫২জন।

অন্যদিকে ছাত্রীদের ৪৭জন এসেছে প্রথম দিনের ২য় শিফট থেকে। আর প্রথম দিনের ৩য় শিফট থেকে মাত্র ২জন এবং দ্বিতীয় দিনের ৩য় শিফট (ইংরেজী মাধ্যম) থেকে কেউ আসেনি।

সমাজবিজ্ঞান অনুূষদভুক্ত ‘বি’ ইউনিটের ছেলে ও মেয়েদের ১৬৩টি আসনের বিপরীতে ১০গুণ শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশ করা হয়েছে। ছাত্র ও ছাত্রীদের শীর্ষ ৫০ জনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছাত্রদের সর্বোচ্চ ২৬জন এসেছে ৪র্থ শিফট থেকে। আর ২য় শিফট থেকে স্থান পেয়েছে মাত্র ২জন। বাকি ৪টি শিফট থেকে ২৪ জন স্থান পেয়েছে।আর ছাত্রীদেরও সর্বোচ্চ ২২জন এসেছে চতুর্থ শিফট থেকে। আর ২য় শিফট থেকে স্থান পেয়েছে মাত্র ৩জন। বাকি ২৮ জন স্থান পেয়েছে অন্য ৪টি শিফট থেকে।

কলা মানবিকী অনুষদভুক্ত ‘সি ইউনিটের’ ৬টি শিফটের পরীক্ষায় ছেলে ও মেয়েদের “বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা, মাদরাসা-কারিগরি” এই চার শ্রেণিতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞান শাখায় ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য ৭৯টি করে আসন রয়েছে। এরমধ্যে ছাত্রদের সর্বোচ্চ ৩২জন এসেছে ১ম শিফট থেকে। ৪র্থ এবং ৫ম শিফট থেকে এসেছে ১জন এবং ৬জন। বাকি তিন শিফট থেকে স্থান পেয়েছে ৫০জন।

অন্যদিকে ছাত্রীদেরও সর্বোচ্চ ৩৪জন এসেছে ১ম শিফট থেকে। ৩য়, ৪র্থ এবং ৫ম শিফট থেকে এসেছে যথাক্রমে ৪, ০ এবং ৩জন।

মানবিক শাখার ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৮০টি করে আসন। এর মধ্যে ছাত্রদের সর্বোচ্চ ২৪জন স্থান পেয়েছে ১ম শিফট থেকে। এবং ৬ষ্ঠ শিফট থেকে ২১ জন। ৪র্থ এবং ৫ম শিফট থেকে স্থান পেয়েছে যথাক্রমে ১জন এবং ৪জন। বাকি দুই শিফট মিলিয়ে স্থান পেয়েছে ৩০জন। ছাত্রীদেরও সর্বোচ্চ ৩৪ জন স্থান পেয়েছে ১ম শিফট থেকে। ৩য়, ৪র্থ এবং ৫ম শিফট থেকে স্থান পেয়েছে যথাক্রমে ৬জন, ৩জন এবং ২জন। বাকি দুই শিফট থেকে স্থান পেয়েছে ৩৫জন।

ব্যবসায় শিক্ষা থেকে ছাত্র ও ছাত্রীদের ২০টি করে আসন রয়েছে। ছাত্রদের ৫ম শিফট থেকে কোন শিক্ষার্থী স্থান পায়নি। ৩য় ও ৪র্থ শিফট থেকে স্থান পেয়েছে মাত্র ২জন। এরমধ্যে ২য়, ১৩তম এবং ১৫তম স্থান ওয়েবসাইটে খুজে পাওয়া যায়নি। ছাত্রীদের মধ্যে ৩য়, ৪র্থ এবং ৫ম শিফট থেকে স্থান পায়নি কোন শিক্ষার্থী। ২য় শিফট থেকে মাত্র ১জন এবং ১ম ও ৬ষ্ঠ শিফট থেকে যথাক্রমে ৫জন এবং ১৪জন শিক্ষার্থী স্থান পেয়েছে।

মাদরাসা শাখায় ছাত্রদের জন্য ১৫টি এবং ছাত্রীদের ১০টি আসন রয়েছে। ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে কোন শিক্ষার্থী স্থান পায়নি ৪র্থ এবং ৫ম শিফটে। আর ১ম শিফটে ছাত্র ও ছাত্রীদের ৪জন করে এবং ৬ষ্ঠ শিফট থেকে যথাক্রমে ৫জন ও ৪জন করে স্থান পেয়েছে।

জীববিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ‘ডি ইউনিটের’ ৯টি শিফটের পরীক্ষায় ছাত্র ও ছাত্রীদের ১৬০টি আসনের বিপরীতে ১০গুণ শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশ করা হয়েছে। ছাত্র ও ছাত্রীদের শীর্ষ ১০০ জনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম দিনের ৫ম শিফট থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ৩৮জন। দ্বিতীয় দিনের ১ম ও ২য় শিফট থেকে যথাক্রমে স্থান পেয়েছে ৪জন ও ২জন।

অন্যদিকে ছাত্রীদের প্রথম দিনের পাঁচ শিফট থেকে ৭৯জন স্থান পেলেও দ্বিতীয় দিনের ৪টি শিফট মিলিয়ে মাত্র ৭জন স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ৪র্থ শিফট (ইংরেজী মাধ্যম) থেকে থেকে কেউ আসেনি।

বিষয়ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ও পরামর্শের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি নজির আমিন চৌধুরী জয় বলেন, “ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষকদের বাণিজ্যিক প্রবণতা পরিহার করা আবশ্যক। এ লক্ষ্যে ভর্তির আবেদনে জিপিএ’র শর্ত বাড়িয়ে দিলে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীরা আবেদন করবে। এতে পরীক্ষার্থী ও শিফটের চাপ কমবে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম এ মতিন বলেন, “চলমান শিফট পদ্ধতিতে বিভিন্ন শিফটের কয়েকগুন প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। যার ফলে একই মানসম্পন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বৈষম্য কমাতে হলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হার কমাতে হবে। শিফটের হার কমে গেলে বৈষম্যও হ্রাস পাবে। সেক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলের শিথিলতা কমিয়ে আবেদনকারীর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। অথবা প্রত্যেকটি শিফটে আসন নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে। তাহলে ভারসাম্য বজায় থাকবে।”

এই সমস্যা থেকে উত্তরণে একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়ার কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আশেপাশের স্কুল-কলেজে পরীক্ষা নিলে একসঙ্গে সব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়া যাবে।”

তবে উপ- উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, “বাইরের কেন্দ্রে পরীক্ষা নিলে জালিয়াতির অধিক্য বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে শিফট ভিত্তিক আসন নির্ধারিত করলে দেখা যাবে কোন শিফটে প্রশ্ন সহজ হলে ঐ শিফট থেকে কম মেধাবীরা চলে আসবে। তবে ভর্তি পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সুযোগ আছে।”

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত