শিরোনাম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

খুনের দায়ে মামলা হলেও নেই বিচার

মুজাহিদ হোসেন, রাবি  |  ১৬:৫৮, মে ১৩, ২০১৯

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই এ বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪১টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি হত্যাকান্ডের পর মামলা করা হয় এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলনও করা হয়। কিন্তু হত্যাকান্ডগুলোর সঠিক বিচার পায়নি খুন হওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীর স্বজনেরা।

এছাড়া উদঘাটন করা হয়নি খুনের রহস্য। শনাক্ত করা হয়নি হত্যাকান্ডে জড়িতদের। এমনকি আসামিরা শনাক্ত হলেও তাদের গ্রেপ্তার করেননি পুলিশ, হয়নি মামলার নিষ্পত্তি। যার ফলে ক্যাম্পাসে একের পর এক হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

গত চার দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো হত্যাকান্ডের ঘটে তার মধ্যে সর্বশেষ হত্যাকান্ডের শিকার হন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপু। ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর নবাব আব্দুল লতিফ হলের ড্রেন থেকে লিপুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর এটিকে হত্যাকান্ড হিসবে আখ্যায়িত করে পুলিশ। লিপু হত্যার পর ওই দিন বিকেলে অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে নগরীর মতিহার থানায় মামলা দায়ের করেন লিপুর চাচা মো. বশির। তবে এ হত্যাকান্ডের আড়াই বছরেও জড়িতদের শনাক্ত করা হয়নি। যার ফলে অন্ধকারে রয়েছে হত্যাকান্ডের রহস্য।

আড়াই বছরে চার জন তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে এখন এ মামলার তদন্তভার পেয়েছেন সিআইডির পরিদর্শক আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সাধ্য মতো আমরা তদন্ত করছি। হত্যাকান্ডের কারা জড়িত এবং হত্যার ‘উদ্দেশ্য’ কি তা আমরা এখনো বের করতে পারিনি। কিছু দিন আগে আমরা ঘটনাস্থালে গিয়ে পরিদর্শন করে এসেছি। তদন্ত করে কিছু পেলে গণমাধ্যকে জানানো হবে।’

জানা যায়, গত ৪০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৪১টি হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ৪ জন শিক্ষক, ছাত্রলীগের ৭ জন, ছাত্র শিবিরের ১৬ জন, জাসদ ছাত্রলীগের ২ জন, ছাত্রদলের ২ জন, ছাত্রমৈত্রীর ৩ জন, ছাত্র ইউনিয়নের ১জন, সাধারণ শিক্ষার্থী ৩ জন, দিনমজুর ২জন ও বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এ্যান্ড কলেজের ১ শিক্ষার্থী। হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে চারজন শিক্ষক হত্যার রায় হয়েছে। সম্প্রতি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফিউল ইসলাম লিলন ও ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকান্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আর বাকি কোন হত্যা মামলারই বিচার হয়নি। এমনকি মামলাগুলো কি অবস্থায় রয়েছে সে বিষয়েও কোথায় কিছু জানা যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার জন শিক্ষক নারকীয় হত্যাকান্ডের শিকার হন। এদের মধ্যে ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় খুন হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইউনুস। এরপর ২০০৬ সালে খুন হন ভূ-তত্তা ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এস তাহের। ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাড়ির অদূরে খুন হন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল ইসলাম লিলন। ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল সকালে ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজ বাড়ির পাশে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুবৃত্তরা।

আরও জানা যায়, গত চার দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ৩৫ জন শিক্ষার্থী ও দুই জন দিনমজুর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন এর মধ্যে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নীহার বানু সর্বপ্রথম হত্যাকান্ডের শিকার হন। এরপর ১৯৮২ সালে ১১ মার্চ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংঘর্ষে মীর মোশতাক এলাহী নামের ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন। এ সময় ছাত্র শিবিরের চার কর্মীও নিহত হন। এরপর ১৯৮৮ সালে আসলাম হোসাইন ও আজগর আলী নামের দুই শিক্ষার্থী নিহত খুন হন। এরপর ওই বছরের মে মাসে ছাত্রমৈত্রীর নেতা জামিল আকতার রতনকে খুন করে শিবির কর্মীরা।

১৯৮৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সংঘর্ষে শিবির নেতা শফিকুল ইসলাম নিহত হন। একই বছর খুন হন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান এবং একজন পত্রিকার হকার। ১৯৯০ সালে শিবির নেতা খলিলুর, ১৯৯২ সালে শিবির নেতা আজিবরসহ চারজন বোমা তৈরির সময় বিষ্ফোরণে নিহত হন। একই বছর নিহত হন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুকিম। ১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলে ছাত্র শিবিরের হামলায় ছাত্রমৈত্রীর নেতা জোবায়ের চৌধুরী রিমু খুন হন। এরপর ওই বছর শিবির ছাত্রদল সংঘর্ষে একজন শিবির নেতা নিহত হয়।

একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা তপন রায়, শিবির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান এবং রবিউল ইসলাম খুন হয়। ১৯৯৫ সালে খুন হয় ইসমাঈল হোসেন সিরাজী নামের এক শিক্ষার্থী। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিবির কর্মীরা ছাতমৈত্রীর নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে কুপিয়ে হত্যা করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ছাত্রদল নেতা আমান উল্লাহা আমানকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির।

২০০৭ সালে তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে ক্যাম্পাসে পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষে এক রিকশাচালক নিহত হয়।

এরপর ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শরীফুজ্জামান নোমানীকে খুন করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে খুন করে লাশ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবির কর্মীরা। ২০১০ সালের ১৫ আগস্টে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে দলীয় কর্মী নাসরুল্লাহা নাসিমকে হত্যা করে ছাত্রলীগ।

২০১২ সালে নিজেদের মধ্যে চাঁদা ভাগাভাগি নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল। এরপর ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীকে খুন করে দুবৃত্তরা। এরপর ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে রুস্তম আলী নামের এক দলীয় কর্মীকে খুন করে ছাত্রলীগের অপর কর্মী। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২০ অক্টোবর গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর খুন হন।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যার ফলে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। সরকারের কাছে অনুরোধ করবো, যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।’

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত