শিরোনাম

ডাকসু নাটকীয়তার শেষ কোথায়

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ ও মু. নূর উদ্দিন  |  ০০:৩৩, মার্চ ১৪, ২০১৯

নানা জল্পনা-কল্পনা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে আংশিকভাবে বিতর্কিত হয়েও ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ও হল সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে প্রশাসন। কিন্তু নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রলীগ ও অন্যান্য প্যানেলগুলোর স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকীয়তায় বারবার নতুন মোড় নিচ্ছে। গতকাল বুধবার দুপুরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোটসহ মোট ৫টি প্যানেল ৪ দফা দাবি নিয়ে উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করে। সেখানে শনিবারের মধ্যে নতুন তফসিল ঘোষণা, ৩১ মার্চের মধ্যে পুনর্নির্বাচন, হল থেকে নির্বাচন কেন্দ্র সরিয়ে নেয়া এবং প্রভোস্ট জিনাত হুদার করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও এই মিথ্যা মামলার সাথে জড়িতদের বের করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা তুলে ধরা হয়।এদিকে, নির্বাচন আগামী ৩ দিনের মধ্যে বাতিল চেয়ে আল্টিমেটাম দিয়েছে নির্বাচন বর্জন করা ৫ প্যানেলের নেতাকর্মীরা। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে প্যানেলগুলোর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ প্যানেলের সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ফারুক হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, আগামী শনিবারের মধ্যেই প্রহসনের এই নির্বাচন বাতিল করতে হবে। একই সাথে পুনঃতফসিল ঘোষণা করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে বাদ দিয়ে সৎ ও নিরপেক্ষ শিক্ষকদের নির্বাচনের দায়িত্ব দিতে হবে। দাবি না মানলে আগামী রোববার থেকে ক্যাম্পাসে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। পরে ক্যাম্পাসে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন পাঁচ প্যানেলের প্রার্থীসহ তাদের সমর্থকরা। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন লিটন নন্দী, উম্মে হাবিবা বেনজীর, অরণি সেমন্তি খানসহ শতাধিক শিক্ষার্থী। বিক্ষোভ মিছিলটি ঢাবি ভিসি কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে ভিসির কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়।এদিকে গত মঙ্গলবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের নবনির্বাচিতদের নিয়ে ছাত্র সংগঠনটির সাবেক ও বর্তমান শীর্ষনেতারা দেখা করতে গেলে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণে এক সাথে কাজ করতে ডাকসু এবং সকল হল সংসদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি করতে হলে মানুষের গালি শুনতে হবে, মানুষের কটূ কথা শুনতে হবে, সমালোচনা সহ্য করতে হবে। মনে রাখবা আজ তোমাকে যে হাত দিয়ে ফুলের মালা পরাবে, সেই হাত দিয়ে তোমাকে জুতার মালাও পরাতে পারে। যে মুখ দিয়ে তোমার প্রশংসা করবে, সে মুখ দিয়ে তোমাকে গালি দিবে। এসব সহ্য করেই তোমাদের রাজনীতি করতে হবে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সব পদে নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন সদ্য নির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর। এসময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেটা চান সেটাই হবে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা সকল পদে পুনরায় নির্বাচন চেয়েছেন, আমিও সেটাই চাই। আর তারা যদি শপথ নিতে বলেন, আমি নেব। এটি দু-একদিন গেলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের সামনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি একথা বলেন। নুরুল হক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে প্রক্রিয়ায় যাচ্ছিলেন, আমাদের কাছে মনে হয়েছিলো তারা সাজানো ছকে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। আমরা বলেছিলাম, এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব হয়। তারপরও আমরা নির্বাচনে এসেছিলাম। সাজানো ছকে নির্বাচনের ব্যাপারটি এখন আমরা তুলে ধরতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘রোকেয়া হলে আলাদা একটি রুমে কিছু ব্যালট অরক্ষিতভাবে রাখা হয়েছিলো। আমরা দেখতে গেলেও তা দেখানো হয়নি। বরং আমাদেরকে মারার জন্য হলের প্রাধ্যক্ষ ছাত্রলীগকে ফোন দিয়েছেন। তখন তাদের ‘লেডি মাস্তান’ বাহিনী আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ছেলে হলে প্রথমবর্ষের ছাত্রদের জোর করে লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এ ধরনের অনিয়ম আমরা দেখেছি।’ নির্বাচনের দিন অধিকাংশ প্যানেল এই ‘তামাশার’ নির্বাচন বর্জন করেছে উল্লেখ করে নুর বলেন, ‘এত কারচুপির পরও আমাকে এবং আখতারকে হারাতে পারেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা পুনঃনির্বাচন দাবি করে তিনদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে। তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আমিও চাই, এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বাতিল করে ৩১ মার্চের মধ্যে সব পদে পুনরায় ডাকসু নির্বাচন দিতে হবে। যারা কারচুপির সাথে জড়িত ছিলো তাদের বহিষ্কার করে অন্যদের নিয়োগ দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে।’ নুরুল হক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তাদের পরিষ্কার বক্তব্য আগে আমাদের জানতে হবে। যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো প্রত্যাহারসহ শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিতে হবে। প্রশাসন এটা ভেবে দেখবে বলেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে তারা যদি বলে আমি শপথ নেব। তারা যদি বলে শপথ না নিতে, আমি নেব না। আমি কখনো আমার অবস্থান থেকে সরে আসিনি। তারা যেটা বলে, সেটা হবে। এটা আরেকটু সময় গেলে বোঝা যাবে।’এদিকে ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আমরণ অনশন করছেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী চার প্রার্থী এবং দুজন সাধারণ শিক্ষার্থী। এর আগে গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন তারা। পুনঃতফসিল না দেয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ারও কথা বলেন তারা। অনশনকারী প্রার্থীরা হলেন- ডাকসু নির্বাচনে শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী শোয়েব মাহমুদ, মুহসীন হল সংসদের সংস্কৃতি সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মো. মাঈন উদ্দিন, জগন্নাথ হল সংসদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অনিন্দ্য মণ্ডল, কেন্দ্রীয় সংসদের ছাত্র পরিবহন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তাওহীদ তানজীম। অনিন্দ্য মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। আমরা নির্বাচনের জন্য পুনঃতফসিলের দাবিতে অনশন শুরু করেছি। একই সঙ্গে আমাদের দাবি- নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের পদত্যাগ।’ স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরনী সেমন্তি খান বলেন, ‘ভিসির কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আগেও বারবার লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কোনোরকম সুরাহা হয়নি। আমরা তাকে একটি সময় বেঁধে দিয়েছি। আমাদের দাবিগুলো না মানলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যাবো।’ তিনি বলেন, যারা অনশনে আছেন, আমি নিজে অনশনে না বসতে পারলেও তাদের পাশে আছি আমি এবং তাদের স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর রাখবো। বাকি শিক্ষার্থীদের হয়তো অনেকেই ক্লাস করছেন। এ সময় তিনি বলেন, নুরুল হক নুর তার বিভিন্ন রকম বক্তব্য পরিহার করে স্ট্রং একটি বক্তব্য নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন এবং শিক্ষার্থীদের চাওয়ার সঙ্গে মিলিত হবেন।
ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হলে কঠোর ব্যবস্থা : ঢাবি উপাচার্য
এদিকে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে অপরাধমূলক কোনো কিছু করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান।তিনি বলেন, ‘সাড়ে চারশ সহকর্মী, প্রাধ্যক্ষ, রিটার্নিং কর্মকর্তা, সিনিয়র কর্মচারীর সমন্বিত ও যৌথ প্রয়াসে বহুল কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। এখানে বিরাট কর্মযজ্ঞ হয়েছে। এত মানুষের আন্তরিকতা, তাদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি, সময়-শ্রমের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনের ক্ষমতা আমার নেই।’গতকাল বুধবার দুপুরে পাঁচটি প্যানেলের নেতাকর্মীরা স্মারকলিপি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর ভিসি কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদেরকে তিনি একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘এ বিশাল কর্মযজ্ঞের যে ফল, তা নস্যাৎ করা এবং তার প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ ঢাবি ভিসি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ একাডেমিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানে কেউ কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা, অশান্ত করার প্রয়াস নিলে সেগুলো কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় সহ্য করবে না। সে বিষয়ে যত্নশীল থাকার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি।’
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত