শিরোনাম

চাল নিয়ে চালবাজি

১১:৫৪, জুন ১৫, ২০১৭

চালের বাজার অস্থিতিশীল। ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় চালের দাম বাড়াচ্ছে। কারণ হিসেবে তারা বলছে বেশি দামে কেনার কথা। চালকল মালিকরা সরকারের নির্ধারিত মূল্যে চাল সরবরাহ করছে না লোকসানের অজুহাতে। সরকার বলছে দেশে চালের কোনো সংকট নেই। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে মজুদ সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

জি টু জি পর্যায়ে যখন চাল কেনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তখন আন্তর্জাতিক বাজারেও চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ দেখানো হচ্ছে সেখানেও নাকি চাল উৎপাদন কম হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হলেও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অজুহাতে সেটা আর হচ্ছে না। আর এভাবেই চলছে চাল নিয়ে চালবাজি।

জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, এখন যা কিছু হচ্ছে তা কৃত্রিম সংকট। সংকট যদি হয় তাহলে ৪ মাস পর হবে। কারণ ধানতো দেশে উৎপাদন হয়েছে। হাওরের বন্যা ও ব্লাস্ট রোগের জন্য যদি কিছুটা কম উৎপাদন হয় তার প্রভাবতো পরে পড়বে। আর যারা এ সংকটের সৃষ্টি করছে তারা সুবিধাভোগী। মন্ত্রী বলেন, আমরা পুলিশ, বিডিআরকে চাল দিচ্ছি। ঘূর্ণিঝড় মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং সিলেটে বন্যার্তদের চাল দিচ্ছি। খাদ্য সংকট থাকলে এগুলো দিই কীভাবে? বেসরকারি পর্যায়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে ট্যারিফ প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্যারিফ কমানোর জন্য আবেদন করেছি কিন্তু আমিতো কমাতে পারি না।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, অকাল বন্যায় নষ্ট হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান। এতে ছয় থেকে সাত লাখ টন চাল কম উৎপাদন হবে। তবে হাওর নিয়ে কাজ করা একাধিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মে’র মতে, হাওর এলাকায় বোরো ধানের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তাতে এবার প্রায় ১৫ লাখ টন চাল কম পাওয়া যাবে। চালের পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সমিতিগুলো বলছে, এবার বোরোতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হবে। সব মিলিয়ে ঢল ও ব্লাস্ট রোগে আসলে কী পরিমাণ বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও আড়তদারদের দেয়া তথ্য সঠিক ধরে নিলেও এখনই যেমন চালের সংকট সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়, তেমনি দাম বৃদ্ধিরও কথা নয়। বাস্তবে ঘটছে এর উল্টো। অর্থাৎ সংকটও চলছে দামও বাড়ছে।

সারা দেশে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতি কেজি চাল ৩৪ টাকা এবং ধান ২৪ টাকা দরে সর্বমোট ১৫ লাখ টন ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে থাকছে ৭ লাখ টন ধান এবং ৮ লাখ টন চাল। ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হবে। এ বছর ধানের উৎপাদন খরচ প্রতিকেজি ২২ টাকা ও চালের উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩১ টাকা। এই হিসাবে কৃষক চালে কেজিতে ৩ টাকা এবং ধানে ২ টাকা লাভ করবে। এই লাভের পরও কেন মিলাররা সরকারকে চাল দিতে রাজি হচ্ছে না।

জানতে চাইলে জামালপুরের মিলমালিক কাজী মো. কাউয়ুম আমার সংবাদকে বলেন, খাদ্য পরিধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। সেখানে কিছু লাভ হতো ব্যবসায়ীদের। কিন্তু এখন বাজারে চালের সরবরাহ কমের কারণে দাম বাড়ছে। কারণ বেশি দামে ধান কিনলে চালের দামও বেশি হবে। তাই দাম বৃদ্ধির কারণে লোকসান দিয়ে কেউ সরকারকে চাল দিতে চাইছেন না। তিনি বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির উপর আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) কমিয়ে দিলে চালের দাম কমে যাবে। প্রসঙ্গত চাল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শুল্ক হার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ হয় রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি)। ফলে ব্যবসায়ীদের ২৮ শতাংশ শুল্ক গুনতে হচ্ছে। এতে দেড় বছর ধরে চাল আমদানি প্রায় বন্ধ। কারণ প্রতি কেজি চালে শুল্ক গুনতে হয় প্রায় ৯ টাকা।

এদিকে সরকারি গুদামে চালের মজুদ এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। যেমন লক্ষ্মীপুর জেলার গুদামে মাত্র ৭১ টন এবং গাজীপুরে ৯০ টন চাল রয়েছে। এখানে হঠাৎ কোনো ডিজাস্টার হলে তখন কী হবে বলাই বাহুল্য। যে কারণে আসন্ন ঈদে সরকার গরিব মানুষদের ভিজিএফ দিতে পারছে না। বাজারে এখন মোটা চাল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকায় রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি। দোকানিরা বলছেন তাদের বেশি দামে কিনতে হয় তাই এই দামে বিক্রি।

এফএও তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, কয়েক বছর ধরে কমার পর আবার বিশ্ববাজারে চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনে চাল উৎপাদন কম হওয়ায় তারা আবারও বিশ্ববাজার থেকে চাল আমদানি শুরু করেছে। আর তাতেই দাম বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চীনে চালের উৎপাদন কমে যাওয়া। চীন বিশ্ববাজারে আমদানি শুরু করলে চালের দাম আরও বাড়তে পারে।

জানাগেছে, সম্প্রতি বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য ভারত ও ভিয়েতনাম প্রতি কেজিতে চালের দাম বাড়িয়েছে আড়াই টাকার বেশি। থাইল্যান্ড বাড়িয়েছে আরও বেশি, সাড়ে ৬ টাকা। বাংলাদেশ সাধারণত পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করে না। সেখানে চালের রপ্তানি মূল্য অপরিবর্তিত। বাংলাদেশে তাদের প্রতি কেজি চালের দর দাঁড়াবে ৩৭ টাকা ৯১ পয়সা। গত ১৪ মে এই দাম ছিল ৩৭ টাকা ৮৬ পয়সা।

কেন এ চালের দাম বৃদ্ধি এ সম্পর্কে এক ব্যবসায়ী জানান, হাওরে ক্ষয়ক্ষতির পর সরকারের পক্ষ থেকে ৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে এই মর্মে চাল উৎপাদনকারী সংশ্লিষ্ট দেশকে চিঠি দেয়া হয়। যেহেতু চাল তাদের কাছে থেকে আমদানি করবেনই। তাই তারা সুযোগ বুঝে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত