শিরোনাম

শাশুড়িকে ঘাতকের হাতে তুলে দিয়ে মৃত্যু সংবাদের অপেক্ষা

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:৩২, নভেম্বর ১৮, ২০১৮

শাশুড়িকে ঘাতকের হাতে তুলে দিয়ে তার মৃত্যু সংবাদের অপেক্ষা করছিলেন পাষণ্ড মেয়ে জামাতা। কেমন রহস্যময়! শাশুড়ি জরিনা খাতুন নিখোঁজের পর তাকে খুঁজতেও বের হন। রাস্তার পাশ থেকে লাশ উদ্ধারের পর জরিনার হত্যামামলার বাদিও হন এ জামাতা। হত্যাকান্ডের শিকার জরিনার লাশের ময়নাতদন্ত থেকে শুরু করে নামাজে জানাজা এবং লাশ দাফনেও ভূমিকা রাখেন তিনি। শাশুড়ির মৃত্যু উপলক্ষে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানের আয়োজনেরও ইচ্ছে ছিলো তার। কিন্তু তার আগেই জরিনার হত্যার মূল রহস্য ফাঁস হয়ে যায়। বয়স্কা জরিনার স্পর্শকাতর হত্যাকান্ড নিয়ে পুলিশ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় রেখে তদন্তে নামে। অবশেষে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন জরিনার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তার মেয়ে জামাতা নূর ইসলাম। পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে জরিনাকে হত্যার জন্য সে ১০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। নিজের বাসায় শাশুড়িকে খাইয়ে-দাইয়ে বাসে তুলে দেয় নূর ইসলাম। যে বাসে জরিনাকে তুলে দেয়া হয়, বাসটি আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলো বিশেষ যাত্রী জরিনার জন্য। ঘাতক ছিলো বাসচালক ও তার কয়েকজন সহকারী। পুলিশ মূল পরিকল্পনাকারী নূর ইসলামসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও এখনো পলাতক রয়েছে ঘাতকরা। ইতোমধ্যে আশুলিয়া এলাকা থেকে জব্দ করা হয়েছে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত বাসটি। স্পর্শকাতর এ মামলাটি তদন্ত করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।গতকাল শনিবার ধানমন্ডি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ায় টাঙ্গাইলগামী একটি বাসে হত্যা করা হয় জরিনা খাতুনকে (৪৫)। বাস থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল তার বাবা আকবর আলী মন্ডলকে (৭০)। আকবর আলীর কাছে খবর পেয়ে ওইদিন রাতেই মরাগাং এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের পাশ থেকে জরিনার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিকে শাশুড়ি খুন হওয়ার পর অজ্ঞাতদের আসামি করে আশুলিয়া থানায় অভিযোগ দিয়েছিলেন জামাতা ও নিহতের মেয়ে রোজিনার স্বামী নূর ইসলাম। কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে আসে নূর ইসলাম নিজেই এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। এই অভিযোগে নূর ইসলাম, নূরের মা আমেনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পাশাপাশি স্বপন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ছিলেন নূর ইসলাম ও জরিনার মেয়ে রোজিনার বিয়ের ঘটক। নিহত জরিনা সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী থানার খাস কাওলিয়া গ্রামের মহির মোল্লার স্ত্রী। তিনি নিজের বাবাকে নিয়ে আশুলিয়ায় জামাতা নূর ইসলামের বাড়িতে এসেছিলেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জে ফেরার জন্য আশুলিয়ার ইউনিক এলাকা থেকে টাঙ্গাইলগামী বাসে ওঠেন আকবর ও জরিনা। ওই সময় আকবর বলেছিলেন, পথে বাসে তাকে মারধর করে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা কেড়ে নিয়ে বাসটি আশুলিয়ার দিকে ফেরত আসে এবং তাকে আশুলিয়া ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়। তিনি তখন টহল পুলিশকে ঘটনা জানালে তারা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মরাগাং এলাকায় মহাসড়কের পাশে জরিনার লাশ পায়। জরিনার শরীরে কোনো ক্ষত না থাকলেও গলায় কালো দাগ ছিল। জরিনার খুনের পরিকল্পনায় আরও জড়িত ছিলেন নূর ইসলামের মা আমেনা বেগম এবং মামা স্বপন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১০ হাজার টাকার চুক্তিতে টাঙ্গাইলগামী একটি মিনিবাস ও বাসের ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টর ও দুই হেলপারকে ভাড়া করে। বাসটি আগে থেকেই আশুলিয়ার শিমুলতলী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ওই বাসে জরিনা ও তার বাবাকে তুলে দেন নূর ইসলাম। পরে বাস থেকে নানা শ্বশুরকে ফেলে দিয়ে শাশুড়িকে হত্যা করে।পুলিশের সংবাদ সম্মেলন থেকে জানা যায়, ৫ বছর আগে মামা স্বপনের মধ্যস্থতায় রোজিনা ও নূর ইসলামের বিয়ে হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকতো। এই বিবাদ মেটাতে জরিনা মেয়ে জামাতার বাড়ি আশুলিয়ায় আসতেন। এজন্য নূর ইসলাম ও তার মা আমেনা বেগম ও মামা স্বপনের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করে। তারা পরিকল্পনা করে জরিনাকে এমন শিক্ষা দিতে হবে যেন সে আর তাদের বাড়িতে না আসে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন জরিনার মেয়ের বাসায় খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিকাল ৫টার দিকে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। জামাই নূর ইসলাম তাদেরকে টাঙ্গাইলগামী একটি মিনিবাসে তুলে দেন। এই বাসটি স্বপন ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই বাসের হেলপার ও সুপারভাইজাররা আকবর আলীকে মারধর করে বাস থেকে ফেলে দেয়। এরপর জরিনাকে তারা হত্যা করে। পরে আকবর বিষয়টি নূর ইসলামকে জানালে সে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূর থেকে জরিনার মরদেহ উদ্ধার করে। ধারণা করা হচ্ছে, জরিনাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ঘটনায় জড়িত বাসচালক, হেলপারসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত