শিরোনাম
চট্টগ্রামে সব সড়কপথে পাচার হচ্ছে ইয়াবা

আড়ালেই থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা

প্রিন্ট সংস্করণ॥ এএইচএম কাউছার, চট্টগ্রাম  |  ০২:০৭, এপ্রিল ২৪, ২০১৮

সড়ক, সমুদ্র ও স্থলপথ দিয়ে প্রতিনিয়মিত পাচার হচ্ছে ইয়াবা। চট্টগ্রামে কোথাও না কোথাও প্রতিদিন ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিজিবি এসব চালানের সাথে যাদের গ্রেপ্তার করছে তারা বহনকারী। কিন্তু নেপথ্যেই থেকে যাচ্ছে এ ব্যবসার সাথে জড়িত গডফাদাররা। প্রতিদিন জড়াচ্ছে নতুন নতুন মুখ। জনপ্রতিনিধি, খোলোয়াড়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী থেকে শুরু করে বাদ যাচ্ছে না কেউ। প্রতিদিন অভিযান চলছে, ধরাও পড়ছে। আর বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য, দেখা মিলছে নতুন নতুন মুখের। সর্বশেষ গত রোববার নগরীর বাকলিয়া থেকে ১৪ হাজার ইয়াবাসহ নাজবীন খান মুক্তা (২৩) নামে এক নারী ক্রিকেটারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভোর পাঁচটায় শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে। গতকাল সোমবার শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আল ইমরান দুই দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নগর পুলিশের বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী জানান, গ্রিনলাইন পরিবহণের এসি বাসে কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় নতুন ব্রিজ এলাকায় তল্লাশির সময় মুক্তা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। তিনি প্রায়ই কক্সবাজার যাওয়া-আসা করতেন। কক্সবাজারে নাহিদ নামের একজনের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে ঢাকায় তার সহযোগী রিপনকে সরবরাহ করতেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থল ও নৌপথে ইয়াবার পাচার হচ্ছে। আর ইয়াবা পাচারের সঙ্গে ৬২ জন গডফাদারের সন্ধান পাওয়া গেছে। জানা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িতদের একটা তালিকা জমা দেওয়া আছে। এক সংসদ সদস্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রায় সব পেশার লোকের নাম ওই তালিকায় উল্লেখ আছে; কিন্তু সব শ্রেণিপেশার মানুষ জড়িত থাকায় প্রশাসন এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। ইয়াবা কেনাবেচা করে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীতে পরিণত হওয়া ব্যক্তিরা পরিবহণ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে বলে তথ্য দিয়েছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিনে নিজেরা পরিবহণ প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়ে সেই গাড়িতে কৌশলে বিশেষ চেম্বার বানিয়ে পাচার করছে ইয়াবা। নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মহসীন বলেন, সংঘবদ্ধ ইয়াবা পাচারকারী চক্র তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। ২১টি ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান কিনে তারা নিজেদের পরিবহণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। সেই পরিবহণে তারা সাধারণত পচনশীল দ্রব্য যেমনÑ মাছ পরিবহণ করছে। মূলত পণ্য পরিবহণের মতো করে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ইয়াবা চলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। সূত্র জানায়, মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার করছে। নাফ নদীর ওপারেই ইয়াবার কারখানা। তারা ইচ্ছা করলে বন্ধ করতে পারবে; কিন্তু তারা জ্ঞাতসারে এটা করছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য রোধ ঠেকাতে বৈঠক হয়। বৈঠকে যা কিছু সিদ্ধান্ত হয় শুধু কাগজকলমে। কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করে না মিয়ানমার। কারণ মিয়ানমারের ইয়াবার বড় মার্কেট বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের ১৩ উপজেলার কিছু কিছু জনপ্রতিনিধি এসব ইয়াবার কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন বলে জানান পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা। চট্টগ্রাম জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশ সুপার এ তথ্য জানান। সড়ক, সমুদ্র ও স্থলপথে নিয়মিত ইয়াবাপাচার হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, এ নিয়ে গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে রাঙ্গুনিয়া, লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া ও সাতকানিয়া তালিকার শীর্ষে রয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার। নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিসিবন্দর) মো. শহীদুল্লাহ বলেন, আমাদের কাছে সাম্প্রতিক যে তথ্য আছে সেটা হচ্ছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন পরিবহণ খাতে বিনিয়োগ করছেন। পণ্য পরিবহণ তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। পণ্যের আড়ালে ইয়াবাপাচারই হচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কারণে প্রথাগত পরিবহণ ব্যবসায়ী যারা আছেন তারাও বিপাকে পড়ছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এর মূল ব্যবসায়ীরাও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠানো হয় টেকনাফের বিশেষ একজনকে। জানাতে হয় কী পরিমাণ ইয়াবা লাগবে, পাঠাবেই বা কোথায়। নির্দিষ্ট পরিমাণ ইয়াবা চলে যায় সেই ঠিকানায়। লেনদেন আরো সহজ করে দিয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। টেকনাফ থেকে ইয়াবা তাই চট্টগ্রাম হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। ২০০৬ সাল থেকেই মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ইয়াবার চালান আসতে থাকে এ দেশে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কয়েক বছর আগেও টেকনাফে পেশা হিসেবে যারা জেলে, রিকশাচালক, বেকার যুবক, পিঠা বিক্রেতা, কৃষক বা ক্ষুদ্র লবণচাষি ছিলেন, তাদের প্রায় অধিকাংশই এখন সচ্ছল, কেউ কেউ কোটিপতি, গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন।
আনোয়ারা গহিরাকেন্দ্রিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান মোজাহের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকার চান মিয়ার ছেলে। এলাকায় যিনি লোকজনের কাছে ভালো মানুষ হিসাবে পরিচিত। ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালে তিনি ইয়াবাপাচার করতেন। র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান মো. মোজাহারের নগরীতে আছে ছয়তলা বাড়ি। এর দ্বিতীয় তলায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। র‌্যাব ৭-এর উপঅধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার সাফায়াত জামিল ফাহিম সাংবাদিকদের বলেন, মোজাহারের দাবি– তার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ, মরিচ ও মসলার ব্যবসা ছিল এবং বর্তমানে সে শাড়ি কাপড়ের ব্যবসা করেন। তার এক সন্তান অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। অন্য সন্তান ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত