শিরোনাম

‘ওরা আমার বাবারে মাইরা হালাইছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১২:২৯, জুলাই ২৩, ২০১৯

 

আমার ছেলেকে ষড়যন্ত্র করে ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়—এটা প্রভাবশালী মহলের চক্রান্ত। প্রভাবশালী মহল তাকে ব্যবহার করার জন্য নয়ন বন্ড হিসেবে তৈরি করেছে। কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো।’

রোববার (২২জুলাই) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যার মামলার প্রধান আসামি ‘বন্দুকযদ্ধে’ নিহত নয়ন বন্ডের মা শাহিদা বেগম।

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন সকালে প্রকাশ্যে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজির নেতৃত্বে দুর্বৃত্তরা নির্মমভাবে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। ওইদিন বিকালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত শরীফ মারা যান।

এ ঘটনায় পরদিন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি ছিল নয়ন বন্ড। এরপর গত ২ জুলাই ভোর রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু হয় নয়ন বন্ডের।

মিন্নির সঙ্গে নয়ন বন্ডের বিয়ের বিষয়ে শাহিদা বেগম বলেন, ‘নয়ন মিন্নিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। পরে শুনেছি, তারা নিজেরাই বিয়ে করেছে। আমি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। আমি নয়নকে বলেছিলাম—মিন্নি ভালো না, ওরে বিয়ে করিস না।’

শাহিদা বেগম বলেন, বিয়ের পরে তাঁর ছেলে এবং পুত্রবধূ কুয়াকাটায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন যে মিন্নি কখনো তাদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও নিয়মিত যাতায়াত করতো।

শাহিদা বেগম বলেনর, ‘আমি টিভির হেড লাইনে পাথরঘাটা বইসা দেখছি, কেউ একজন কইছে—আমার ছেলে সীমান্তের কাছে আছে। সেই ছেলে তিন দিন পর পুরাকাটা এসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায় কীভাবে? তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। তার হাতের নক ও কান নাই। ওরা আমার বাবারে (নয়ন) মাইরা হালাইছে।’

তিনি বলেন, এই মিন্নির জন্য আমার ছেলেটা শেষ হয়ে গেল। নয়নকে ধরার জন্য পুলিশ বাড়িতে এসে কিছুই রাখেনি। সব ভেঙে দিয়েছে। এটার কাচ পুলিশ ভেঙে দিয়েছে। এই ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মিন্নি অনেক সাজগোজ করেছে। পাউডারসহ ওপরের অংশ নিয়ে গেছে পুলিশ।

মিন্নির ভিডিও চ্যাটের স্ক্রিন শট দেখিয়ে নয়নের মা বলেন, তারা তো সব সময় ভিডিওতে কথা বলত। এই দেখেন ছবি। এতে দেখা যায়, নয়নের চ্যাটিং মেসেঞ্জার প্রোফাইলে মিন্নির ছবি দিয়ে লেখা ‘বউ’। আর মিন্নির চ্যাটিং প্রোফাইলে লেখা এএস মিন্নি অর্থাৎ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।

এসব দেখিয়ে নয়নের মা বলেন, পুলিশ প্রায় সবকিছুই নিয়ে গেছে। আমার কাছে এগুলোই অবশিষ্ট আছে। এগুলো আমার কাছে থাকার কথাও নয়। একদিন নয়নের মোবাইলের স্ক্রিন টাচ (পরদা) নষ্ট হয়ে গেলে কিছুদিন আমার ফোনটা ব্যবহার করে। পরে আমাকে যখন মোবাইল ফিরিয়ে দেয় তখন এই ছবিগুলো ছিল।

শাহিদা বেগম বলেন, নয়ন কেন তার নামের সঙ্গে বন্ড বা ০০৭ সেভেন লিখত তা আমি জানি না। সে বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতাম। কিন্তু তাকে তো মেরেই ফেলল। কিন্তু যারা তাকে বন্ড বানাল তাদের কি কিছুই হবে না। যারা তাকে নয়ন থেকে নয়ন বন্ড বানিয়েছে তাদেরও ধরা হোক। যাতে আর কোনো নয়ন বিপথগামী সন্ত্রাসী বা বন্ড না হতে পারে।

নয়ন বন্ডের মা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলে দোষী, এটা আমি জানি। কিন্তু সে তো একদিনে নয়ন বন্ড তৈরি হয়নি। তাকে তৈরি করা হয়েছে। প্রভাবশালী মহল তাকে ব্যবহার করার জন্য নয়ন বন্ড হিসেবে তৈরি করেছে।’

কোন প্রভাবশালী মহল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা ঠিক বলতে পারবো না। তবে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তার মুখ থেকে যদি প্রভাবশালী মহলের সব অপকর্মের ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়, সেই জন্যই।’

এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের বাপ নাই, তাই ওরে মাইরা ফ্যালা হইছে। যাতে আসল রহস্য আড়াল করা যায়। আমার ছেলে তো খুনি ছিল না। সে মাদকসেবী ছিল। নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে।’

সাব্বির আহমেদ নয়ন কীভাবে নয়ন বন্ড হয়ে গেল? এ প্রশ্নের জবাবে শাহিদা বেগম বলেন,‘ সে ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু ক্লাস টেন থেকে আস্তে আস্তে মাদকের জগতে প্রবেশ করে। কে হ্যারে বন্ড বানাইলো, জিরো জিরো সেভেন বানাইলো, তোমরা খুঁইজা বের করো।

এর আগে নয়ন বন্ড ১২ লাখ টাকাসহ ধরা পড়েছিল। সে এত টাকা কোথায় পাইলো? কে দিলো? তোমরা খুঁইজা বের করো।’

প্রসঙ্গত, ‘০০৭ লাইসেন্স’ একটি বিখ্যাত হলিউড সিনেমা সিরিজ। সিনেমার মৌলিক গল্প অনুযায়ী ০০৭ হচ্ছে মানুষ হত্যার লাইসেন্স। এতে যিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন তার নাম জেমস বন্ড।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, এই ছবি দেখে নয়ন বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। এরপর নিজেকে ‘০০৭ লাইসেন্স’ সিনেমার নায়ক ভাবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজের নামের সঙ্গে নিজেই যুক্ত করে দেন ‘বন্ড’ শব্দটি এবং একই সঙ্গে গড়ে তোলেন ০০৭ নামের সন্ত্রাসী বাহিনী।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নয়নের বাড়ি থেকে অন্তত ২০ ধরনের আলামত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে নয়নের সঙ্গে মিন্নির ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের বেশকিছু ছবি, মিন্নির ব্যবহৃত লিপস্টিক, চিরুনি, চিরুনিতে আটকে থাকা মিন্নির চুল, কামিজ, চুলের ক্লিপ, ফেসপাউডার, চোখের ভ্রূতে ব্যবহৃত আই ব্রো, সিমকার্ড এবং কয়েকটি মোবাইল ফোনসেট।

এমএআই

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত