শিরোনাম

নওগাঁয় বাড়ছে কদর নকশী কাঁথার

এম আর রকি, নওগাঁ  |  ১৩:২২, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

গ্রামীণ ঐত্যিহের অবিচ্ছেদ্য অংশ নকশী কাঁথা। কেবল সুঁই আর সুতার কারুকাজ নয়, এ যেন চিরন্তন বাঙালির ভালোবাসার গল্প। সুচের ফোঁড়ে আর বাহারি রঙের সুতায় বিভিন্ন নকশা তৈরি করে নেয় নকশী কাঁথায়। গ্রামীণ নারীরা মনের মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করেন এসব কাঁথা। যেখানে নতুন আর পুরনো কাপড়ে তৈরি এসব কাঁথায় সুচের ফোঁড়ে ভালোবাসা মিশে আছে। আধুনিক নারীদের কাছে গ্রামের নকশী কাথার ব্যাপক কদর রয়েছে। আর তাই দিন দিন এর চাহিদা তৈরি হচ্ছে। কোনো ধরণের প্রশিক্ষণ ছাড়াই নওগাঁর মান্দা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের প্রায় ৫০ জন নারী নকশী কাঁথা তৈরি করছেন।

নকশী কাঁথা এক প্রকার শিল্প। এক সময় নকশি কাঁথা প্রায় ঘরে ঘরে তৈরি করা হতো। গ্রামে খাওয়ার পর ক্লান্ত দুপুরে ঘরের সব কাজ সেরে নারীরা ঘরের মেঝে, বারান্দা বা গাছের ছায়ায় মাদুর পেতে বসত নকশী কাঁথা নিয়ে। এক একটি নকশী কাঁথা তৈরি করতে কখনো কখনো প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড়ে তৈরি করে এক একটি না বলা কথা। কতশত ইতিহাস আর গল্প।

নকশী কাঁথা সাধারণত দুই পাটের অথবা তিন পাটের হয়ে থাকে। চার-পাঁচ পাটের কাঁথা শীত নিবারণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাতে কোনো কারুকার্য থাকে না। কিন্তু নকশী কাঁথায় বিভিন্ন নকশা থাকে। যেখানে লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি, হলুদ প্রভৃতি রঙের সুতো দিয়ে সুচের ফোঁড়ে নকশা করা হয়ে থাকে। অঞ্চলভেদে যেমন নকশী কাঁথা, বাঁশপাতা ফোঁড়, বরকা ফোঁড়, কইতা, তেজবি ফোঁড় ও বিছা ফোঁড় ইত্যাদি নামে পরিচিত। তবে নওগাঁতে নকশী কাঁথা হিসেবেই পরিচিত।

জেলার মান্দা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের গৃহবধূ রুবিয়া পারভীন বলেন, সাংসারিক কাজের পাশাপাশি এ নকশি কাঁথা তৈরি করি। এক একটি কাঁথা তৈরি করতে প্রায় তিন-চার মাস সময় লেগে যায়। তবে আকার ভেদে কাঁথা তৈরিতে সময় কমবেশি হয়ে থাকে। কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয় বাড়িতে ব্যবহারের জন্যই মূলত কাঁথা তৈরি করা হয়। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই এ কাজ করছি গত ১৫-২০ বছর থেকে।
একই গ্রামের গৃহবধূ শিরিনা আক্তার, সানজিদা খাতুন ও মুক্তিরানী বলেন, পুরনো অথবা নতুন কাপড় দিয়ে মূলত নকশী কাঁথা তৈরি করা হয়। প্রথমে কাপড়ের ওপর বিভিন্ন নকশার ছক আঁকাতে হয়। আর এ ছকের ওপর বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে নকশা ফুটিয়ে সুজনি ফোঁড়, কাঁথা ফোড় ও বকুল ঝাড় কাঁথা তৈরি করা হয়।

গৃহবধু ফরিদা পারভীন বলেন, কাঁথা শুধু বাড়ীর জন্যই তৈরি করি তা নয়। আমরা অনেকে মজুরি হিসেবেও কাঁথা সেলাই করে দিই। তবে নকশী কাঁথা তৈরিতে যে পরিমাণ পরিশ্রম হয় সে তুলনায় আমরা মজুরি পাই না। ৪ বাই ৫ ফুট আকারের কাঁথা ১ হাজার ৫০০ টাকা, সাড়ে তিন বাই ৫ ফুট আকারের কাঁথায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মজুরি পাওয়া যায়।

তবে যে মজুরি পাওয়া যায় তা যথেষ্ট না। আর এ থেকে যে বাড়তি আয় হয় তা ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি সাংসারিক কাজে ব্যয় করা হয়। তবে তিনি বলেন, এখন চাহিদা দিন দিন বাড়ছে নকশী কাথার। এর ফলে কম মুজুরী হলেও কাজে ব্যস্ততা বাড়ছে ।

মান্দা গোটগাড়ী শহীদ মামুন হাইস্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্রামের নারীরা যারা এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা দরকার।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, গ্রামীণ ঐত্যিহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ নকশী কাঁথা। এটি এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। নকশী কাঁথাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত গ্রামীণ নারীদের সহযোগিতার জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া অন্য কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা করা যেতে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত