শিরোনাম

যে কারণে এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে এসপি হারুনের দ্বন্দ্ব

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি  |  ১৩:৩২, এপ্রিল ০৮, ২০১৯

নারায়ণগঞ্জে এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে এসপি হারুনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যা প্রকাশ পেয়েছে গত ৬ এপ্রিল দুপুরে শহরের ইসদাইর এলাকার বাংলা ভবন কমিউনিটি সেন্টারে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ব্যানারে জরুরী কর্মী সভায় শামীম ওসমান ও নেতা-কর্মীদের বক্তব্যে।

‘নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী পরিবারকে ধংসের চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ ব্যানারে ওই সভা থেকে পুলিশের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে স্থানীয় এমপি একেএম শামীম ওসমান বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জে পোশাকধারী কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেয়া হবে না। পোশাকধারী কোনো সন্ত্রাসীর স্থান নারায়ণগঞ্জের মাটিতে হবে না। পোশাকধারী একটি বাহিনী নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে ডেকে নিয়ে চাঁদাবাজি করছে।’ তিনি কোনো ব্যবসায়ীকে এক টাকাও চাঁদা না দিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দেখা করার দিন শেষ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।’

এর মধ্যে সভাস্থলে ‘এসপি হারুনের পদত্যাগ চাই। নারায়ণগঞ্জকে গাজীপুর হতে দেয়া হবে না।’ এসপি হারুন ‘ঘুষখোর’সহ নানা ধরনের স্লোগান দেয়া হয়। তখন এমপি শামীম ওসমানসহ সিনিয়র নেতারা নেতা-কর্মীদের নিভৃত করেন।

যে কারণে শামীম ওসমানের সঙ্গে পুলিশের বিরোধ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময় থেকেই নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের সম্পর্ক খারাপের দিকে যেতে থাকে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে পুলিশের দিকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিতে থাকেন শামীম ওসমান। তার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতার বিরুদ্ধে পুলিশ মামলাও করেছে। সর্বশেষ গত ২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ও চেক প্রদান অনুষ্ঠানে শামীম ওসমান পুলিশের প্রতি ইঙ্গিত করে বেশ কঠোরতার সঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা দেন।

এসকল বক্তব্যের দুইদিন পর শামীম ওসমানের সমর্থিত নেতা হিসেবে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম পুলিশের কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার জন্য গত ২৯ মার্চ তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মঞ্জুর কাদের বাদী হয়ে জিডি করেন। এরপর গত ১ এপ্রিল রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পাগলায় মেরি এন্ডারসনে বিপুল পরিমাণ মদ ও বিয়ার উদ্ধারের ঘটনায় শামীম ওসমানের শ্যালক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ টিটুর নাম আসে। ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের শীর্ষ সন্ত্রাসী কথিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মীর হোসেন মীরুর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যার বিরুদ্ধে ৪টি হত্যা, একটি অস্ত্র, একটি মাদক, দুটি চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার এবং নিরীহ মানুষের ওপর হামলাসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। মীরু মূলত শামীম ওসমানের রাজনীতি করে। এছাড়াও ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক কাউন্সিলর মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান মুন্নাকে মসজিদের টাকার হিসাব নিয়ে সংঘর্ষের ফলে হাতকড়া পড়িয়ে আটক করা হয়েছিল। এরই মধ্যে পাগলায় প্যারাগন মাল্টিপারপাস প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তাদের মারধরের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন পাগলা বাজার ব্যবসায়ী বহুমুখী সমিতির সভাপতি শাহ আলম টেনু।

নেতাকর্মীদের নামে মামলা নিয়ে যা বললেন শামীম ওসমান:
কর্মী সভায় এমপি শামীম ওসমান বলেছেন, ‘আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেই আমরা ভয় পাবো সেটা ভাবার কারণ নাই। মনে রাখতে হবে আমরা এখনও বুড়ো হই নাই। আমাদের নিয়ে খেইলেন না, খেলাইয়েন না। আমরা এখনো জোয়ান আছি। মন্ত্রীকে প্রশ্ন করায় জুয়ার মামলা দিবেন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। আমার আত্মীয়কে মদের মামলা দিবেন। এসব দিয়ে আমাকে কাবু করতে পারবেন না।’

আওয়ামী লীগের কর্মী সভায় ছিলেন না সভাপতিরা:

জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের ব্যানারে কর্মী সভা হলেও এতে জেলার সভাপতি আব্দুল হাই ও মহানগরের সভাপতি আনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন না। তবে সভায় বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগরের সেক্রেটারি খোকন সাহা, সহ সভাপতি চন্দন শীল প্রমুখ।

যা বললেন নারায়ণগঞ্জ এসপি:
পুলিশ ও এসপির বিরুদ্ধে স্লোগানের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এ ধরনের কোনো কিছু আমার জানা নেই। এমন কোনো কাগজও আমার কাছে আসেনি। স্লোগান তো কতকিছুই হতে পারে তবে আমি জানি না।’

তিনি বলেন, ‘মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, জুয়া ও অবৈধ বালু উত্তোলন- এসবের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং সেটা অব্যাহত থাকবে। যখন অভিযান চলবে এতে সবাই খুশি হয় না। কেউ না কেউ ঘটনার স্বীকার হবে। সবাইকে খুশি করা সম্ভব না। আমাদের পুলিশের চাকরিটা এমনই, সবাইকে খুশি করা যায় না। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে, সেটা যে যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন।’

যা বললেন আওয়ামী লীগের সভাপতিরা:

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটাকে আওয়ামী লীগের কর্মী সভা বলা চলে না। যেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতিরা নেই, সেটা পূর্ণাঙ্গ আওয়ামী লীগের সভা হয় না। সেখানে শামীম ওসমানের অনুগতরা ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘দলের হাই কমান্ড থেকেই এসপিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি এসপি যদি ভুল ত্রুটি করে থাকে তাহলে সেখানে গিয়ে বলা উচিত। এখন তাকে কিছু বললে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। যেহেতু সরকার প্রধান তাকে নিয়োগ দিয়েছেন, সেহেতু তাকে কিছু বললে সরকারের দুর্নাম হয়। তাই দুইজনের মধ্যে আলোচনা করে এটা সমাধান করা উচিত। আর শামীম ওসমান নিজেই বলেছেন শেখ হাসিনা অবগত আছেন, তার নজরে আছে। এখন যা করার কেন্দ্র থেকে করবে। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি- দলের হাই কমান্ড মাদক, জঙ্গি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থাকার জন্য বলছে। প্রশাসনও সেই ভাবে কাজ করছে। এখন এটার মধ্যে দলীয় কিছু লোকজন পড়ে গেছে। এজন্যে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বক্তৃতা করা আমরা সমর্থন করি না। আমাদের এখানে বলার কিছু নেই। কেন্দ্রীয় কমিটি দেখবে এতে দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে কী-না? তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, ‘আমি হাসপাতালে আছি। এখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারছি না।’ এ কথা বলেই ফোন রেখে দেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত