শিরোনাম

রক্ত দিয়ে যৌথ প্রতারণাকে রুখে দেয়ার ঘোষণা

১১:১৫, জুন ১৯, ২০১৭

যৌথ প্রযোজনার নামে অনেকদিন ধরেই দেশিয় চলচ্চিত্রের সাথে যৌথ প্রতারণা করে আসছে এ দেশের চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট একটি বিশেষ চক্র। তাদের বিরুদ্ধে ফের রুখে দাঁড়িয়েছে চলচ্চিত্রের ১৪টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। তারা বলেছেন, বুকের রক্ত দিয়ে হলেও যৌথ প্রযোজনার নামে যৌথ প্রতারণা বন্ধ করবো। কেউ কেউ বলেছেন, অনেক সহ্য করেছি আর করবো না।

গতকাল রোববার দুপুর ১২ টায় বিএফডিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘটের মাধ্যমে যৌথ প্রযোজনার নামে নানা অনিয়মের প্রতিবাদ জানান তারা। এরপর দুপুর ১টায় একটি মিছিল নিয়ে রাজধানীর ইস্কাটনে অবস্থিত চলচ্চিত্র সেন্সরবোর্ড ঘেরাও করে চলচ্চিত্র শিল্পী-কুশলীরা। এতে অংশ নেন চিত্রনায়ক ফারুক, রিয়াজ, রুবেল, ইমন, ডিপজল, মিশা সওদাগর, পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, মালেক আফসারী, মোহাম্মদ হোসেন জেমী, চিত্রনায়িকা পপি, সাইমন, বাপ্পী, পরীমনি, শান, কায়েস আরজু, নিঝুম রুবিনা, মৌমিতা মৌ ও প্রযোজক সমিতির নেতা খোরশেদ আলম খসরু প্রমুখ।

মিছিলে তারা দেশের চলচ্চিত্রের স্বার্থ বিরোধীদের উদ্দেশ্যে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ‘সেন্সরবোর্ডের দালালরা হুশিয়ার সাবধান, সেন্সরবোর্ডের অনিয়ম-মানি না মানবো না- এমন আগুনঝরা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। এই অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে খ্যাতনামা অভিনেতা ফারুক বলেন, এখন চলচ্চিত্রের মানুষদের মুখে থু থু দিচ্ছে ভিনভেশি দালালরা। অনেক সহ্য করেছি, আর না। এবার আমরা রুখে দাঁড়াবো। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের চলচ্চিত্র মানুষের কথা বলে, স্বাধীনতারর কথা বলে। ’৬৯-এ বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে চলচ্চিত্র বিকাশিত হয়। সেই চলচ্চিত্রে আজ ভিনদেশি দালালদের কালো থাবা। আমাদের সেন্সরবোর্ড দেশের চলচ্চিত্রের কথা না ভেবে আর কারো কথা ভাবলে আমরা মানবো না। চিত্রাভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজলের কণ্ঠেও ছিলো ক্ষোভের আগুন।

বাংলাদেশ ও ভারতে চলচ্চিত্র এবং টিভি চ্যানেল প্রদর্শনে নানা অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশের কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল, সিনেমা ইন্ডিয়াতে চলে না। তাহলে এদেশে ইন্ডিয়ান চ্যানেল, ছবি কেনো চলবে? আমাদের দেশে যারা ইন্ডিয়ান ছবি দেখেন, তারা এটা বর্জন করুন। শরীরে একফোঁটা রক্ত থাকতে আর এদেশে ইন্ডিয়ান ছবি চলতে দেয়া হবে না। ডিপজল ক্ষোভের স্বরে বলেন, দুঃখ লাগে ভাবলে যে, আমরা চলচ্চিত্রের মানুষ যাদের শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিলো, তারা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছি। কী জমজমাট এফডিসি ছিলো! কিছু নষ্ট মানুষ সেটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ভিনদেশের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। সেন্সরবোর্ড কিছুই দেখছে না। সরকারও নিবর হয়ে আছে। অনুরোধ করবো সবাই দেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কথা ভাবুন। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি ভাবার। এই অভিনেতা ও প্রযোজক বলেন, ইন্ডিয়ান বা ভিনদেশি ছবির অবৈধ মুক্তি এদেশে বন্ধ করতে যত প্রতিবাদ করা লাগে আমরা করব। সিনেমা হলের কিছু মালিক দালালদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।

যদি এদেশে যৌথ প্রযোজনার নামে প্রতারণার ছবি চলে, তবে সিনেমা হল সিলগালা করা হবে। সেন্সরবোর্ডের কঠোর সমালোচনা করে ডিপজল আরও বলেন, সেন্সরবোর্ডে যারা আছেন, তারা আমাদেরই মানুষ। তারা যে কাজ করছেন সেটা খুব একটা ভালো করছেন না। এর দায়ভার তাদের নিতেই হবে। টাকা খায় মানুষ। কিন্তু সেন্সরবোর্ডের সদস্যরা যেভাবে টাকা খেয়ে অনিয়ম করছে, সেটা খুব খারাপ করছে। কারণ, বিষয়টা আজ প্রকাশ্য চলে এসেছে। সবখানে বলাবলি হচ্ছে- অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রের নিয়ম ভঙ্গ করা ছবিগুলোকে দিনের পর দিন ছাড়পত্র দিয়ে যাচ্ছে সেন্সরবোর্ড। বক্তব্যের পর এক পর্যায়ে চলচ্চিত্র শিল্পী-কুশলীরা সেন্সরবোর্ডের সামনের রাস্তায় বসে পড়েন। তারা বলেন, আমরা তথ্যমন্ত্রণালয়ে গিয়ে মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করতে চাই না। আমরা সেন্সরবোর্ডের অনিয়ম বন্ধ করতে চাই। কেননা, গেল কয়েক বছর ধরেই দেখছি- এই মন্ত্রী শুধুই আশ্বাস দিতে পারেন। সমাধান নয়।

পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে একশ্রেণির মানুষ চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠা করা এই এফডিসি বাঁচাতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পরিচালক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব শাহীন সুমন বলেন, রক্ত দিয়ে হলেও এই অনিয়মের যৌথ প্রযোজনা ও সেন্সরের স্বেচ্ছাচারীতা বন্ধ করবো। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন, বঙ্গবন্ধুর এফডিসি, এখানে কারো একক ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব চলবে না। আমরা চলচ্চিত্র পরিবার আজ এক হয়েছি। সকল অনিয়ম দূর করবোই। সমিতির সহসভাপতি চিত্রনায়ক রিয়াজ বলেন, কিছুতেই যৌথ প্রতারণার ছবি মেনে নেয়া হবে না।

আন্দোলন কেবল শুরু হয়েছে। আমরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবো। এই অনিয়ম আমরা বন্ধ করেই ছাড়বো। শিল্পী সমিতির আন্তর্জাতিক সম্পাদক চিত্রনায়ক ইমন বলেন, আমরা যৌথ প্রযোজনার নামে এই অনিয়ম আর নেতিবাচক ছবি নির্মাণ চাই না। কলকাতার শিল্পীরা আসুন যান কোনো সমস্যা নেই। নিয়ম-রীতি মেনে সিনেমা করুন তাতেও সমস্যা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রকর্তৃক প্রদত্ত আইন ভেঙে ইন্ডাস্ট্রিকে অস্তিত্ব সংকটে ফেললে আমি সইবো না। এই আন্দোলনের সঙ্গে আছি, ছিলাম ও থাকবো। শিল্পী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও চিত্রনায়িকা পপি বলেন, আমরা যৌথ প্রযোজনায় ছবি চাই না। যদি যৌথ প্রযোজনায় ছবি হয়, তবে নীতিমালা অনুসারে হতে হবে। শিল্পী সমিতির সদস্য এবং চিত্রনায়ক সাইমন সাদিক বলেন, অনিয়মের যৌথ প্রযোজনা বন্ধ একমাত্র তথ্য মন্ত্রণালয় কঠোর হলেই হবে। তারাই সব কলকাঠি নাড়তে পারে। সাইমন আরও বলেন, এদেশে ভিনদেশি ছবি মুক্তির বিপক্ষে আমরা শিল্পী-কলাকুশলী। এদেশের চলচ্চিত্র দিয়ে যারা স্টার হয়েছেন, তারা দেশের ছবিতে অভিনয় করুন। ভিনদেশি ছবি বর্জন করুন। ভিনদেশিদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করুন, কিন্তু নিজের পরিচয় ভুলে নয়।

চিত্রনায়ক বাপ্পী বলেন, কারও বিপক্ষে বা কোনো মহল-ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ করে নয়, এ আন্দোলন দেশের সংস্কৃতি ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি রক্ষার আন্দোলন। যারা এ আন্দোলনের পক্ষে নন, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ করে তুলবেন।তিনি আরও বলেন, এত কষ্টের ইন্ডাস্ট্রি আমাদের। আমরা স্বপ্ন দেখি প্রতিদিন শুটিং হবে, আনন্দ উৎসবে ছবি মুক্তি পাবে। কিন্তু হচ্ছেটা কী? রোজার দিনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। দিনকে দিন দেশের চলচ্চিত্র ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, ভিনদেশি ছবির বাজার বাড়ানো হচ্ছে। কৌশলে দেশিয় ছবিগুলোকে হল দেয়া হচ্ছে না। ভিনদেশ থেকে আসা মানহীন ছবিগুলোও শতাধিক হল পেয়ে যাচ্ছে।

এভাবে চললে যারা চলচ্চিত্রে কাজ করে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকি, তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। প্রযোজক নেতা খোরশেদ আলম খসরু বলেন, রোজা রেখে চলচ্চিত্রকে বাঁচানোর জন্য রাস্তায় নেমেছি। চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত। তাদের বাঁচাতে হলে এই অনিয়মের যৌথ প্রযোজনা বন্ধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই ইন্ডাস্ট্রি (বিএফডিসি) বাঁচাতে হলে যৌথ প্রযোজনা বন্ধ করতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত