শিরোনাম

দৃষ্টির সীমানার বাইরে শাহনাজ রহমতউল্লাহ

প্রিন্ট সংস্করণ॥বিশেষ প্রতিবেদক  |  ০০:৩৩, মার্চ ২৫, ২০১৯

‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়।’ শাহনাজ রহমতউল্লাহকে যেতে দেয়া হলো তবে সোনার গাঁয় নয়, দৃষ্টির সীমানার বাইরে বিধাতার সান্নিধ্যে। তিনি ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ দেখেছেন তবে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ চেয়েছিলেন এই শিল্পী। তার শেষ বাংলাদেশ হয়েছে। প্রতিটা বাঙালির চাওয়াও তাই। না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ।শাহনাজ রহমতউল্লাহ গেয়েছিলেন, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, যে ছিল হূদয়ের আঙিনায়, সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়, সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি।’ আমরাও আর এই চেনা মুখ আর দেখব না। দৃষ্টির সীমানায় তাকে আর পাব না। হূদয়ের আঙিনা থেকে তিনি চলে গেছেন দূর অজানায়। গত শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তিনি চলে গেলেন। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। তিনি চলে গেলেও রয়ে গেছে তার মধুঝরা কণ্ঠের কালজয়ী গানগুলো।দেশের বরেণ্য এই সংগীতশিল্পীর জানাজা গতকাল বাদ জোহর রাজধানীর বারিধারার ৯ নম্বর রোডের পার্ক মসজিদে হয়। জানাজা শেষে রাজধানীর বনানীতে সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বাংলাদেশের গানের জগতে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম শাহনাজ রহমতউল্লাহ। ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করা এ শিল্পী ১০ বছর বয়স থেকেই গান শুরু করেন। সেই বয়সেই গান করেন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন আর বেতারে। খেলাঘর থেকে শুরু করা এ শিল্পীর কণ্ঠ শুরু থেকেই ছিল বেশ পরিণত। গজলসম্রাট মেহেদি হাসানের শিষ্য হয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশের দেশাত্মবোধক গানের দিকটা ধরতে গেলে সবার আগেই চলে আসে শাহনাজ রহমতউল্লাহর নাম। তার ভাই আনোয়ার পারভেজ ছিলেন সুরকার, আরেক ভাই চিত্রনায়ক জাফর ইকবালও করতেন গান। গানের ক্ষেত্রে তাদের মায়ের অনুপ্রেরণাই ছিল বেশি।ক্যারিয়ারের ৫০ বছর পূর্তির সময়ই গান থেকে বিদায় নেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। এছাড়া আরও একটি কারণ হলো ধর্মপরায়ণ জীবন বেছে নেয়া। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘ওমরাহ করে আসার পর আর গান করতে ইচ্ছা করেনি। আমি নামাজ পড়া শুরু করেছি। নামাজ পড়েই সময় কাটছে। ৫০ বছরের ওপরে গান গেয়েছি, আর কত গাইব?’তিনি আরও জানিয়েছিলেন, পবিত্র কাবা, মহানবী (সা.)-এর রওজা শরিফ দেখে আসার পর থেকে পার্থিব বিষয়ে আগ্রহী নন তিনি। বাকিটা জীবন সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতায় প্রার্থনা করেই কাটাতে চান। তিনি টিভি দেখেন না, রেডিও শোনেন না বলে জানান।১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। গানের জগতে ৫০ বছরে শাহনাজ রহমতউল্লাহর মাত্র চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। যার সব কয়টিই ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। তার প্রথমটি ছিল প্রণব ঘোষের সুরে ‘বারটি বছর পরে’, তারপর প্রকাশিত হয় আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘শুধু কি আমার ভুল’।শাহনাজ রহমতউল্লাহকে ১৯৯২ সালে একুশে পদক দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিতে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া ২০১৬ সালে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা, ২০১৩ সালে সিটি ব্যাংক থেকে গুণীজন সংবর্ধনা দেয়া হয় তাকে। এছাড়া গান গেয়ে আরও অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘আমার দেশের মাটির গন্ধে’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে আমায় বল’, ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’, ‘কে যেন সোনার কাঠি’, ‘মানিক সে তো মানিক নয়’, ‘যদি চোখের দৃষ্টি’, ‘সাগরের তীর থেকে’, ‘খোলা জানালা’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’, ‘আমি তো আমার গল্প বলেছি’, ‘আরও কিছু দাও না’, ‘একটি কুসুম তুলে নিয়েছি’ এ রকম অসংখ্য গান দিয়ে শাহনাজ রহমতউল্লাহ বাংলাদেশের অগণিত শ্রোতার মন জয় করেছেন।সংগীত শিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সরকারপ্রধান প্রয়াত এ শিল্পীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত