শিরোনাম

লক্ষ্মীপুরের কৃতিমান দুইজন ভাষা সৈনিক

১৫:০৫, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৬

 

(কমরেড তোয়াহা ও সানা উল্লাহ নূরীর ছবি)

ভাষার জন্য যারা দিয়ে গেল প্রাণ ভুলিবনা আমরা, দেশের জন্য যারা দিয়ে গেল প্রাণ ভুলিবনা আমরা। এ গানটি যখনই বেজে উঠে তখন হৃদয় কতটা ছুঁয়ে যায় তার অনুভুতি প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই। ২১ ফ্রেব্রুয়ারী শহীদ দিবস (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) যখন আসে, তখন জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা হয়। আলোচনা সভাগুলোতে ওঠে আসে ভাষা সৈনিক সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, সফিউলসহ অনেকের নাম। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের দুইজন ভাষা সৈনিক “কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা” ও সানা উল্লাহ নূরীর নাম কেউ উচ্চারণ করেন না। ভাষা আন্দোলনের সময় শহীদ না হলেও কমরেড তোয়াহা এবং সানা উল্লাহ নূরী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে রেখেছেন তাদের অসামান্য অবদান। সানা উল্লাহ নূরী একাধারে একজন সাংবাদিক এবং সাহিত্যিকও ছিলেন। আর কমরেড তোয়াহা ভাষা আন্দোলনের পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবুও আমরা কত অকৃতজ্ঞ এই মহান দুইজন ব্যক্তিকে স্মরণে আমাদের নেই কোনো উদ্যোগ।      

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ এবং বিশ্ব বিখ্যাত মুক্তজ্ঞান কোষ উইকিপিডিয়ায় কমরেড তোয়াহা’র কৃতকর্মের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। উইকিপিডিয়া অনুসারে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা’র ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা অবদান তুলে ধরা হলো :
মোহাম্মদ তোয়াহা ( গড়যধসসধফ ঞড়ধযধ ) ছিলেন, ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী এবং রাজনীতিবিদ। এই আন্দোলনের সময় তাঁকে অন্যতম একজন ছাত্রনেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯২২ সালের ২ জানুয়ারী মোহাম্মদ তোয়াহা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার কুশাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও পরবর্তীতে তাঁর পরিবারবর্গ কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট এলাকায় স্থানান্তরিত হন।
তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন। পরে ১৯৪৮ সালে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ সম্পন্ন করেন। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে এসে সে সময়ের মঙ্গার বিরুদ্ধে নামতে গিয়ে রাজনীতিতে পদার্পন করেন তিনি।
তিনি ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে অধিকাংশ পোষ্টার, লিপলেট, নিবন্ধ তৈরী করেছিলেন। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সাল তারিখে যখন তোয়াহা’র নেতৃত্বে একটি দল সচিবালয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিতে যান, তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তিনি ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হন এবং অসুস্থ্যতা কাটিয়ে উঠতে তাঁকে হাসপাতালে এক সপ্তাহ থাকতে হয়েছিল।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির একজন নেতা হিসেবে কমরেড তোয়াহা সরকারের সাথে সকল ধরনের বৈঠকে অংশ নিতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ভিপি ছিলেন। যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেখানে এসেছিলেন, তোয়াহা তাকে তাদের ভাষা সম্পর্কে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছিলেন।

সরকার যখন আরবি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে বাংলা লেখার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিল তখন তিনি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদে তিনি সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৫২ সালের শেষের দিকে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। দুই বছর পর মুক্তি পান এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন যেখানে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবেও তিনি নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় রামগতি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন তিনি। মোহাম্মদ তোয়াহা “পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি (এম. এল.) নাম ত্যাগ করে শুধু কমিউনিষ্ট পার্টি (এম এল) নাম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে বা পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য বাম দল ও গ্রুপের সমন্বয়ে “বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা. লে.) গঠন করেন।
২৯ নভেম্বর ১৯৮৭ সালে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা মৃত্যুবরণ করেন। তখন অবিভক্ত রামগতি বর্তমান কমলনগর উপজেলার হাজিরহাটে তাঁকে সমাধিস্থ করার পর ওইস্থানেই কমরেড তোয়াহা স্মৃতি রক্ষায় একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়।

১৯৯২ সালে হাজিরহাট বাজারের পাশে “কমরেড তোয়াহা’র” নামানুসারে “তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়” নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭শ’ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
তোয়াহা স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যায়েদ বিল্লাহ স্বাক্ষাতকারে জানান, ভাষা সৈনিক কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা স্মৃতি রক্ষায় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ১৯৯২ সালে বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে এটি সরকারের এমপিও ভুক্ত হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭শ’ শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছর থেকে এখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তায় একটি ভাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
কমরেড তোয়াহা’র পারিবারিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক যায়েদ বিল্লাহ জানান, কমরেড তোয়াহা’র দুই মেয়ে রয়েছে, তাঁর কোনো ছেলে সন্তান ছিলনা। দুজনই স্বামী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। বড় মেয়ের নাম শাহানা বেগম ছিনু ও ছোট মেয়ের নাম রেহানা ইয়াসমিন পুস্প। ছিনুর স্বামী এ্যাডভোকেট আবুল খায়ের, আর পুস্পর স্বামী কর্ণেল (অবঃ) আব্দুল খালেক।

ভাষা সৈনিক সানা উল্লাহ নূরী সম্পর্কে জানা যায় :
তিনি ছিলেন, একাধারে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। ১৯২৮ সালের ২৮ মে লক্ষ্মীপুর জেলার অবিভক্ত রামগতি বর্তমান কমলনগর উপজেলার চর ফলকন গ্রামে তাঁর জন্ম। দারুচিনি দ্বীপের দেশ, ভ্রমনকাহিনী, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, কবিতাসহ অসংখ্য কালজয়ী গ্রন্থের লেখক ছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। জগন্নাথ কলেজে পড়ার সময় তিনি বামছাত্র রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় যোগ দেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ঢাকা কলেজের নুরপুর ভিলা ছাত্রাবাসে “রাট্রভাষা বাংলা না উর্দু” নামক সেমিনারে তিনি যোগ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলেন। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের মূখপত্র “অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ইহসানের” সহযোগী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সানা উল্লাহ নূরী। এ পত্রিকাটি মূলত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সাংবাদিক ও ভাষা সৈনিক সানা উল্লাহ নূরী ২০০১ সালের ১৬ জুন ৭৩ বছর বয়সে মারা যান।
তাই ফেব্রুয়ারী মাস আসলে আমরা অবশ্যই আমাদের জেলার এই দুই কৃতিমান সন্তানকে স্মরণে উদ্যোগ নিতে হবে।




এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত