শিরোনাম

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৫ তম জন্মবার্ষিকী শুক্রবার

শেখ শাহীন, কেশবপুর (যশোর)  |  ১৮:১১, জানুয়ারি ২৪, ২০১৯

বিশ্ব সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনের মহান দিকপাল ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৯৫ তম জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে জন্মস্থান সাগরদাঁড়িতে ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ৭ দিন ব্যাপী মধুমেলা। এমেলার উদ্বোধনী করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য এমপি ।

যশোর জেলা থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিনে কেশবপুরের অধুনা কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে বাংলা ১২৩০ সনের ১২ মাঘ (১৮২৪খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারী)শনিবার বাবা রাজনারায়ন দত্ত মাতা জাহ্নবী দেবীর কোলে জন্মে ছিলেন মহাকবি মধুসূদন। কবির পূর্ব পুরুষের আদি বাসস্থান খুলনা জেলার অন্তর্গত তালা গ্রাম হলেও তার শৈশব শিক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল পিত্রালয় ও জন্মস্থান সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাঠশালায় মাতা জাহ্নবীর তত্ত্বাবধানে। রামায়ন, মহাভারত কাহিনীর প্রতিআকর্ষণের প্রেরণা এই সময়ে মায়ের কাছ থেকেই তিনি প্রথম অর্জন করেছিলেন।

উত্তরকালে মধুসূদন প্রতিভার বিকাশ, পুষ্টি ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল মূলত এই প্রেরণাকে ভিত্তি করে। তিনি রচনা করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অমূল্য এক সম্পদ ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য। মধুসূদন দত্ত ১৮৩৩ সালে কলকাতার হিন্দু কলেজের জুনিয়র বিভাগে ভর্তি হন। ১৮৪১ সালে কলেজের সিনিয়র বিভাগে প্রবেশ করেন। অসাধারণ মেধাবী হয়েও মধুসূদন ছিলেন খামখেয়ালী ও বিলাসপ্রিয়। এখান থেকে তিনি অর্জন করেছিলেন মানমন্ত্রের বিশ্বাস ও গভীর ইংরেজী সাহিত্য প্রীতি, তেমনি তার মনে সৃষ্টি হয়েছিল দেশীয় আচার ও ভাবনার প্রতি অশ্রদ্ধা। অবশ্য এ অশ্রদ্ধোবোধ একদিন কেটেছিল। নীবিড় করে বাংলাকে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততোদিনে তার জীবন ক্ষয় হবার পথে।

১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্র“য়ারী খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষা নিয়ে মধুসূদন খ্রিষ্টান হলেন । যার ফলে তাকে হিন্দু কলেজ ছাড়তে হলো। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভর্তি হলেন শিবপুর বিশপস কলেজে নতুন নাম মাইকেল মধুসূদন হিসেবে। এখানে তিনি গ্রীক,ফার্সি,জার্মান,ইতালী,ল্যাটিন এবং সংস্কৃতি ভাষা শিখতে শুরু করেন। এছাড়াও হিব্র“,তেলেঙ্গু,হিন্দুস্থান ও তামিল ভাষাও জানতেন তিনি। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে হঠাৎ করে কলেজ ছেড়ে মধুসূদন দত্ত মাদ্রাজ চলে যান। মাদ্রাজে অবস্থানরত ৭ বছরে তিনি শিক্ষক,কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সামাজিক পরিচিতি পেয়েছিলেন। পত্রিকার সম্পাদকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশের ডাক পেতেন তিনি। এখানে অরফ্যান এসাইলাম বিদ্যালয়ে ইংরেজী শিক্ষক থাকাকালিন বিদ্যালয়ের বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা মাষ্টাভিসকে বিয়ে করেন। কবির এ দাম্পত্য জীবন সুখের না হলেও তিনি ৪ সন্তানের জনক হয়েছিলেন।

সংসার জীবনের পাশাপাশি এমেলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া নামক এক ইংরেজ কন্যার সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। এসম্পর্ক পরবর্তীতে হেনরিয়েটাকে কবির জীবন সঙ্গিনীর মর্যাদা দেয়। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে কবির মা পরলোক গমন করেন। কবি মায়ের স্নেহভরা গভীর ভালোবাসা হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েন। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যালয় বিভাগে দ্বিতীয় শিক্ষকের পদ গ্রহন করলে কবির জীবনে আবার গতি ফিরে আসে। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুন কবি ব্যারিষ্টারী পড়তে ইংল্যান্ড যান। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ছেড়ে যান প্যারিসে।

এখানে কবিকে আর্থিক দন্য জেঁকে বসল। তাঁর দূর্দিনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এগিয়ে আসেন বন্ধু হিসেবে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। কবির জীবদ্দশায় গৌরদাস বসাক,মনোমোহন ঘোষ,ঋষিরাজ নারায়ন,ভূদেব মুখোপাধ্যায় বন্ধু হিসেবে পাশে ছিলেন। তার প্রতিভার আকর্ষণে তদানীন্ত রাজা জমিদারদের মধ্যে রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ বাহাদুর, মহারাজ স্যার যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর,রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ বাহাদুর ও আশুতোষ দেব প্রমুখ বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছেন। ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের১৭ নভেম্বর কবির স্বপ্নচারি সাধ ব্যারিষ্টারি পাশ করেন।

দেশে ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে আইনি ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এ ব্যবসা ভালো না লাগায় চাকরি নেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে অনুবাদের পরীক্ষক পদে। মাসিক দেড় হাজার টাকা বেতনের চাকরি তিনি দুবছরের মাথায় ছেড়ে দেন। পুনুরায় শুরু করেন আইনি ব্যবসা। ব্যারিষ্টার হলেও কোর্টের আইন যুদ্ধ তাঁর ভালো না লাগায় কোর্ট ছেড়ে ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে চাকরি নিলেন মানভূমে পঞ্চকোট রাজ্যের আইন উপদেষ্টা পদে।

বাংলা ভাষায় আধুনিক সাহিত্যের বহুমাত্রিক সূচনা হয় মধুসূদন দত্তের কলম থেকে। নতুন জীবন মন্ত্র,তেজ ও বীর্যের পূর্ণবেগ নিয়ে মধুসূদনের আর্বিভাব ঘটেছিল ঊনিশ শতকে। তাঁর জীবন আর কর্ম দুইই বর্ণময়। তিনি নিজে যেমন ছিলেন বিস্ময়কর মানুষ তেমনি তাঁর সাহিত্যে বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত তার প্রথম বাংলা কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থটি ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে কবি রাজা যতীন্দ্র মোহন ঠাকুরের নামে উৎসর্গ করেছিলেন।

‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ কৃষ্ণ বিরহকাতরা কাব্য, ব্রজবালা বাধিকার বিলাপ ও আর্তি সম্পান্ন গীতি কবিতা গুচ্ছ। তিনি ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ বাংলা সাহিত্যে নতুন ও প্রথম পত্র কাব্য। মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক মাত্র পুনাঙ্গ মহাকাব্য, যা মধুসূদন দত্তের কালজয়ী কীর্তি তিনি রচনা করেন।

এছাড়া শর্ম্মিষ্ঠা নাটক,মধুসূদন দত্তের নাট্য সাহিত্যের সৃজনশীল প্রয়াসের স্বীকৃতি। পদ্মাবতী নাটক, কবি গ্রীক পুরানের অবলম্বে রচনা করেন। বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো। ব্যঙ্গত্বক প্রহসনটি রচনা করে কবি প্রভাবশালী মহলের দৃষ্টি কাড়েন। কৃষ্ণ কুমারী নাটক’ কবি রাজনৈতিক,ঐতিহাসিক নির্ভর কাহিনীতে রচনা করেন।‘মায়া কানন’ নাটকটি ১৮৭৩ খ্রি: বেঙ্গল থিয়েটারে প্রতিষ্ঠা পায়। গদ্য রচনা ‘হেকটর বধ’চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী তার অমর সাহিত্যকর্ম।

মধুসূদন দত্ত শরীরের প্রতি অত্যধিক অত্যাচারের ফলে ১৮৭৩ খ্রি: অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় পরিবারসহ তাকে বেনে পুকুরের বাড়ি এনে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি করেন জেনারেল হাসপাতালে। ২৬ জুন কবির জীবন সঙ্গী হেনরিয়েটা মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ কবিকে নীরব করে দেয়। শারীরিক অসুস্থ্যতা আর মানসিক কষ্টে ২৯ জুন বেলা ২টায় মহাকবি মধুসূদন বিদায় নেন পৃথিবী থেকে। কবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়িতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় সপ্তাহ ব্যাপী মধুমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত