শিরোনাম

প্রেম ও প্রয়োজন

মোহাম্মদ তুহিন  |  ১৬:৫২, জানুয়ারি ২৩, ২০১৯

রোজকার মতো ক্লাস শুরুর ঘন্টা বেজে গেছে। কলেজের ক্লাসরুমে ছেলে-মেয়েরা যে যার সিট দখল করে অপেক্ষা করছে প্রোফেসরের। ক্লাসটা ইংরেজি সাহিত্যের। আর প্রোফেসর রয়ের ক্লাস চট করে কেউ মিস করতে চায়না। তা সে তার পড়ানোর ধরনের জন্যই হোক আর প্রোফেসরের লুকের জন্যই হোক। আর এই দলে একমাত্র ব্যতিক্রম হল শাওন। মেয়েটার চোখদুটো বড় মায়াবী, সেই দীঘল চোখে একবার ডুব দিলে ফিরে আসা আর সম্ভব নয়। তথাকথিত নায়িকাসুলভ তার আর কিছুই নেই। লম্বা একরাশ মেঘের মতো চুল,ছিপছিপে গড়ন আর গায়ের রঙ শ্যামলাই। এক ঝলক দেখলে রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলির সাথে মিল পাওয়া যায় বটে। ইয়াং প্রোফেসর এম.রয় এর জন্য ক্লাসের এমনকী সারা কলেজের মেয়েরাও যখন পাগল, তখন শাওনই একমাত্র নিউট্রাল পার্টে থাকে। সে রোজকার পড়া মন দিয়ে বোঝে, প্রশ্ন-উত্তরে ভাগ নেয়, ফাঁকা সময়ে লাইব্রেরিতে সময় কাটায় বইয়ের সাথে আর তারপর ক্লাসের শেষে যথাসময়ে বাড়ি চলে যায়।তার বন্ধু বলতে বিশেষ কেউ নেই। কিন্তু সবার প্রয়োজনে সে পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেনা। তাই সবাই তার সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতেই আগ্রহী। আজও শাওন একই রকম নিশ্চুপ হয়ে আছে। শুধু তফাতের মধ্যে আজ তার চোখ দুটো বিষাদ মেখেছে, কিন্তু আবারও কারণ সেই অজানাই। আর ফলস্বরূপ সে জানলার ধারের সিট থেকে নীচের ঝিলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। প্রোফেসর রয় ক্লাসে এলেও আজ তার অন্যমনস্কতা কাটেনি। প্রোফেসর রয় শাওনকে শুরু থেকেই অবসার্ভ করে আসছেন।মেয়েটা তাকে বরাবরই আকর্ষণ করে। ওর এই চুপ করে থাকা,সবার মধ্যে থেকেও নিজেকে গুটিয়ে রাখা রয়কে ভাবায় বিশেষ করে। তিনি বরাবরই আন্দাজ করে এসেছেন যে,মেয়েটার একটা গল্প আছে,যেটা আজ পর্যন্ত কেউ জানেনা বা জানতে চায়নি। আজ অনেকক্ষণ ধরে নোটিশ করার পর তিনি আর পারলেন না। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেলেন শাওনের ডেস্কের দিকে। তখনও শাওন একই রকম আনমনা। শাওনের নাম ধরে ডাকতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল শাওন। তার দীঘল চোখ কিছু মুহূর্তের জন্য মিলিত হল রয়ের চোখের সাথে। বছর তিরিশের মেঘ রয় মনে মনে এমন চোখ জোড়ার তারিফ না করে পারলেন না। কিন্তু বাইরে কিছু বুঝতে না দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,”কিছু কী হয়েছে শাওন শাওন খানিক অপ্রস্তুত হল। তারপর সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রয় কে সম্মান দিয়ে বলল, না Sir.It’s ok... মেঘ মৃদু হেসে নরম স্বরে বললেন,শাওন নিজেকে শান্ত করো,আর পড়ায় মন দাও।ঝর তো সবকিছু এলোমেলো করে দেওয়ার জন্যই আসে। তাই তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করতে শেখো। দেখবে ঝর থেমে গেলে একটা নতুন শুরু তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। শাওন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে প্রোফেসর মাথা নেড়ে নিজের ডেস্কের দিকে রওনা দিলেন।সবাই তো প্রোফেসরকে শাওনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে জেলাস তো হয়েই ছিল, এখন প্রোফেসরের শান্ত¡না দেওয়া দেখে মনে মনে শাওনের প্রতি ঘৃণায় ফেটে পড়ল।মেঘের এতে কিছুই যায় আসে না,তাই সে আবার বলতে শুরু করল শেক্সপিয়ারের “Othello” নাটকের Act5,scene 2 থেকে, ও kissed thee ere I killed thee: no way but this,Killing myself, to die upon a kiss. সেই মুহূর্তে শাওনের চোখের সামনে প্রোফেসর এম.রয়ের স্বর আর তার বিবরণ দেওয়া ওথেলো আর ডেসডিমনা ছাড়া আর কিছু ছিল না। প্রতিটা মুহূর্ত শাওনের মনে গেঁথে যাচ্ছিল প্রোফেসর রয়ের দৃপ্ত স্বরের সাথে।শাওনের কাছে প্রোফেসর রয় ছিল ভগবানের মতো, তার আদর্শ। এত কম বয়সে পি.এইচ.ডি করে চাকরি পাাওয়া আর সর্বোপরি প্রতিটা সূ⊃2; বিষয়ে তার জ্ঞান, বোঝানোর অসীম দক্ষতা তাকে মুগ্ধ করত। সে বরাবরই প্রোফেসরকে শ্রদ্ধা করত, কিন্তু আজ তার বলা এই সামান্য কিছু কথা শাওনের মনে প্রোফেসরের প্রতি ভালোলাগা আরো অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গেছে। এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন। শাওনও দুর্দান্ত রেজাল্ট করে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ অতিক্রম করে কলেজ জীবনের শেষ বর্ষে এসে উপস্থিত। মেঘ আর শাওন এখন লাইব্রেরিতে মাঝেমাঝেই সময় কাটায়। শাওন কোনোদিনই ছাত্রীর গন্ডি অতিক্রম করে মেঘের কাছে বিশেষভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেনি। আর মেঘ চেয়েও নিজের মনের কথা শাওনকে ভেঙে বলতে পারেনি। তাই বেশিরভাগ দিনই ওদের মধ্যে সাহিত্য নিয়েই আলোচনা হত। চলত ডিবেট, মতের আদান-প্রদান এমনকী দেশ-বিদেশের বিষয় নিয়ে কথা-বার্তাও। সেদিন লাইব্রেরিটা বেশ ফাঁকাই ছিল। লাইব্রেরির দোতলায় এক কোণে টেবিলে বই নিয়ে একাই বসে ছিল শাওন,বা বলা ভালো সে মাথা নীচু করে শুয়েছিল। মেঘ রোজকার মতোই চেনা টেবিলের দিকে এগোতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল। শাওনকে সে এভাবে কোনোদিন দেখেনি।কাছে এগিয়ে যেতে ও ফোঁপানির আওয়াজ পেল। কাঁধে উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে শাওন উঠে বসেছে ততক্ষণে। কিন্তু চোখের জল মুছতে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। শাওনের টলটলে গভীর চোখে চোখ পড়তেই মেঘের ভিতর সব তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। এই প্রথমবার সে তার সমস্ত প্রাচীর ভেঙে দিয়ে শাওনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শাওন প্রথমে অবাক হলেও মেঘকে জড়িয়ে ধরতে ভুল করল না। একরাশ খোলা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে মেঘ শাওনের কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে বলল, কাঁদছ কেন শাওন ধাতস্থ হতে সময় নিল। তারপর বলল,”স্যার তুমি বুঝবে না। রোজ রোজ নরক থেকে ফিরে আসার যন্ত্রণা সবাই বোঝে না।”বলেই নিজের চুলে ক্লিপ আটকাতে আরম্ভ করল বা বলা ভালো কিছু লুকোতে চেষ্টা করল। কিন্তু মেঘ ততক্ষণে শাওনের গলায়,ঘাড়ে দাঁতের আর পোড়া দাগের ক্ষত দেখে নিয়েছে। মেঘ মনে মনে ভেঙে পড়লেও সে জানে শাওন নিজে থেকে মুখ না খুললে কিছুই জানা সম্ভব নয়। তাই কথা না বাড়িয়ে সে শাওনকে নিজের মোবাইল নাম্বারটা ওর মোবাইলে সেভ করে দিল। আর বলল,”যদি মনে হয় স্যারকে তোমার প্রয়োজন,তাহলে দ্বিধা না করে অবশ্যই একটা ফোন কোরো। শাওনের ঠোঁটে একটা ম্লান হাসি ফুটেছিল। ও মাথা নীচু করে বলেছিল, সব কিছু জানলে হয়তো শাওনকে তুমি ঘৃণা করবে। তবুও...”কথাটা শেষ করেনি শাওন। শুধু নীরবে উঠে চলে গিয়েছিল লাইব্রেরি ছেড়ে। সেদিন ঘুম আসেনি মেঘের চোখে। কেবল একটা অস্থিরতা যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।রাত একটায় অবশেষে ফোনটা বাজল মেঘের।শাওনের নাম্বার দেখেই মেঘ সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল।ওপার থেকে গোঙানির সাথে শাওনের গলা ভেসে এল,”স্যার এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাও। আমি আর পারছি না।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত