শিরোনাম

আকাশ কুসুম

জাকিয়া সুলতানা উর্মি  |  ১২:৫০, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮

অনেকক্ষণ যাবৎ এই পুরোনো খাটের ময়লা বিছানার ওপর বসে আছে আকাশ। জায়গাটা কেমন যেন স্যাঁতস্যাতে। চারিদিকে আবছা অন্ধকার। তার ওপর আবার তেল চিটচিটে বালিশের কাভারটা থেকে একটু পরপর উটকো একটা গন্ধ নাকে এসে লাগছে। সম্ভবত নাপথ্যলিনের। এই অন্ধকার পল্লীতে আজ সে প্রথম এসেছে। খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে ফেলে আকাশ। বাবা অবশ্য পরে আর একটা বিয়ে করেন, কিন্তু সৎমাকে সে কখনো মেনে নিতে পারেনি নাকি সৎমা তাকে মেনে নিতে পারেনি এটা নিয়ে সে এখনোও কনফিউজড। তবে বড়লোক বাবা টাকা পয়সার কোনও কমতি রাখেননি। যখন যা কিছু চেয়েছে তাই পেয়েছে। শুধু পায়নি ভালবাসা। সামনে বসে থাকা মেয়েটির বয়স কত হতে পারে সেটা নিয়েই এখন ভাবছে সে ? গোলগাল মুখ, টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাকানো টানা নাক, গায়ের রংটা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। সস্তা ভারী মেকআপের আড়ালে ঢাকা পরে গেছে। তবে চোখদুটো অসম্ভব রকমের মায়াবী। এই মেয়েকে ভালো জামা কাপড় পরিয়ে সভ্য সমাজে ছেড়ে দিলে কে বলবে এ একজন পতিতা। আর সভ্য সমাজের মানুষ গুলিতো আরও ভয়ানক। তারা রাতের আঁধারে পতিতাপল্লীর অলিগলিতে হেঁটে বেড়ায় আর দিনের আলোতে পতিতা দেখে মুখ সিটকায়।

নীরবতা ভেঙ্গে আকাশ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল,
-নাম কি তোমার?
-জ্বী স্যার, কুসুম।
-বাহ, ভারি মিষ্টি নাম তো।থাকো কোথায় ?
-এইখানেই থাকি স্যার। এই পল্লীই আমার বাসা।
-ওহহ...তো পড়াশুনা কতদূর করেছ?
-স্যার, পতিতারা লেখাপড়া করে না।

আকাশ খেয়াল করল, মেয়েটি আস্তে আস্তে বুকের ওপর থেকে কাপড় সরানো শুরু করেছে।

-কুসুম, তোমাকে কাপড় খুলতে হবে না।
-কেন স্যার ?? আমাকে কি আপনার পছন্দ হয়নি ??
-নাহ, ব্যাপার টা মোটেও তা নয়। আমি আসলে এগুলোর জন্য এখানে আসিনি।

কুসুমের চোখজোড়া এক রাশ বিস্ময় নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

-আচ্ছা কুসুম, তুমি কি আমার সাথে একটু ছাদে যেতে পারবে ? আজ তোমাকে নিয়ে আকাশের সপ্তর্ষিমণ্ডলের তারা দেখবো।

-স্যার, আপনি এইগুলা উল্টাপাল্টা কি বলতেছেন? আমি একজন পতিতা। শরীর বেচা আমার ধর্ম, আমার রুটিরুজি। আপনি আপনার কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে যান। বাইরে আমার আরো কাস্টমার দাঁড়ায় আছে।

-ঠিক আছে। কুসুম, তোমার প্রতিদিনের রোজগার কত?

-১৫০০ টাকা স্যার। সেখান থেকে কিছু টাকা দালাল ভাইজানকে দেওয়া লাগে। আর বাকি যা থাকে সেটা আমার।

-ওয়েল, আমি তোমাকে ২০০০ টাকা দিব। তুমি বাকি কাস্টমার দের চলে যেতে বল।

কুসুম কি বলবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। লোকটা পাগল নাকি। একটা পতিতাকে নিয়ে রাতের আকাশের তারা দেখবে। তাও আবার টাকা খরচ করে।

আকাশ আর কুসুম ধীর পায়ে ছাদে উঠল। চিলেকোঠার দেওয়াল টাতে হেলান দিয়ে বসলো দুইজন। সত্যিই তো। আজ আকাশে অনেক বড় একটা চাদঁ উঠেছে। আর তার কিছুটা দূরে ৭ টি তারার মেলা বসেছে। কুসুম এর আগেও তারা দেখেছে, কিন্তু আজকের মতো এতটা মুগ্ধ সে আগে কখনও হয়নি।
রাতের স্নিগ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে, কুসুম আজ কোটি কোটি তারার ভিড়ে, ৭ টি অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রকে যেন আলাদাভাবে, নতুন করে আবিষ্কার করছে।

-কুসুম....?
-হুমমমম
-সপ্তর্ষিমণ্ডলের দেখা পেয়েছ?
-জ্বী স্যার।

আকাশ কুসুমের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চাদেঁর আলোতে মেয়েটিকে রুপকথার পরীদের মতো লাগছে। ছোটবেলায় মায়ের মুখে সে অনেকবার এই পরীর গল্প শুনেছে।

আকাশ আবারো বলতে শুরু করলো,
-ভৃগু, মরীচি, অত্রি, পুলহ, পুলস্ত্য, ক্রাতু, বশিষ্ঠ । বৈদিক শাস্ত্র মতে এই ৭ টি নক্ষত্রই সপ্তঋষি নামে পরিচিত ।গোলাকার অতি উজ্জ্বল এই সেভেন বেয়ার, গ্রেট বেয়ার (Great Bear) কিংবা বিগ ডিপার নামেও পরিচিত।

জোতিষীদের মতামত অনুযায়ী, তুমি যদি এদের উপর আঙ্গুল রেখে কোনো উইশ করো, তাহলে সেটা পুরন হয়ে যাবে।

-স্যার, উইশ আবার কি? আগেতো কখনো শুনি নাই।

-উইশ মানে ইচ্ছা। তুমি যেটা চাইবে সেটাই পেয়ে যাবে।

-কি বলেন স্যার? যা চাইবো সেটাই পেয়ে যাব। (কুসুমের চোখে বিস্ময়)

-হ্যাঁ। তবে তোমাকে অবশ্যই ভালো কিছু চাইতে হবে। মানুষের ক্ষতি হবে এমন কিছু চাওয়া যাবে না।

আকাশ জানে কুসুম এখন ঠিকই চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন আর কিছু টাকা চাইবে।

কুসুম হাতের আঙ্গুল গুলো ছড়িয়ে দিয়ে, তারাগুলোর উপর রেখে, চোখ বন্ধ করে, বিড়বিড় করে কি যেন চাইছে।
আকাশ মেয়েটির সরলতার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে।কুসুম চোখ খুললো। সে চোখে ইচ্ছে পুরনের খুশিরা লুটোপুটি খাচ্ছে। ব্যাপারটা অনেক ইন্টারেস্টিং।

-স্যার, আপনি কিছু চাইবেন না?
-না, কুসুম।
-কিন্তু কেন?
-নক্ষত্ররা মরা মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। আমার বয়স যখন ৯ বছর, তখন মাকে হারিয়েছি। গত ১২ বছরে মাকে অনেক চেয়েছি কিন্তু পাইনি। তাই আর চাইতে ইচ্ছে করেনা।

কুসুম চুপ করে আছে। ইতিমধ্যে কুসুমের হাতটা কখন যে আকাশের হাতের উপর চলে গেছে দুইজনের কেউই টের পায়নি।আকাশ আস্তে করে মাথাটা কুসুমের কোলের উপর রাখলো। কুসুম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম আদরে। আকাশ এখন একটু ঘুমাবে। অনেক দিন হয়ে গেছে সে শান্তিতে ঘুমোয়নি।

মধ্যরাতের এই নিঃশব্দতার আড়ালে, কুসুম যেন আকাশের সমস্ত শান্তি গুলোকে পাহারা দিচ্ছে। এদের দেখলে কে বলবে যে, এদের একজন বড়লোক বাবার ছেলে আর একজন পতিতা। স্রষ্টার সৃষ্ট দুটি প্রানীর আসল পরিচয় তারা মানুষ।

আস্তে আস্তে রাত বাড়ছে। গভীর থেকে গভীরতম হচ্ছে। একসময় চারিদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। ঘুম ভেঙ্গে আকাশ নিজেকে কুসুমের কোলে আবিষ্কার করলো। কুসুম দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। এই মুহূর্তে কুসুমকে সোনার প্রতিমার মতো লাগছে। অন্য সবার চোখে হয়তো সে একজন পতিতা, কিন্তু আকাশের চোখে সে প্রতিমার মত পবিত্র।

আর যে ফুলকে হাজার মানুষ ছুঁয়ে যায়, সে ফুল ততক্ষণ পর্যন্ত অপবিত্র হয়না, যতক্ষণ না তুমি তাকে অপবিত্র করার উদ্দেশ্যে ছুঁয়ে দাও। অপবিত্র কখনো মানুষের শরীর হয়না, মানুষের মন অপবিত্র হয়।

আকাশ ঘুম থেকে উঠে বসলো। ইতিমধ্যে কুসুমেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। দুইজনে মিনিট পাঁচেক বোবার মতো বসে রইলো। তারপর সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। আকাশকে আর একটুপর বেরিয়ে যেতে হবে। পকেটে হাত দিয়ে ১০০০ টাকার ২টা নোট বের করে, কুসুমের দিকে বাড়িয়ে দিলো সে। কিন্তু আকাশকে অবাক করে দিয়ে টাকাটা ফিরিয়ে দিল কুসুম।

-কি হয়েছে কুসুম? তুমি টাকাটা ফিরিয়ে দিলে যে?
-আমার টাকা লাগবে নাহ স্যার। পারলে কোনো একদিন আবার আইসেন। দুইজনে মিলে ভৃগু, অত্রি, ক্রাতু আর পুলহদের দেখবোনে। আকাশ ঠিক কি উত্তর দিবে ভেবে পাচ্ছে নাহ।আইনস্টাইন,নিউটন,আর্কিমিডিস,গ্যালিলিও অনেকেই অনেক কিছু আবিষ্কার করে রেখে গেছেন। কিন্তু মানুষের মনের উচ্চতা মাপার যন্ত্রটি আবিষ্কারের কথা কারোর মাথায় আসেনি। যন্ত্রটি থাকলে হয়তো উচ্চতার মাপকাঠিতে কুসুমকে ১০ এ ১০ দেওয়া যেত।

আকাশ চলে যাচ্ছে। সে জানেনা সে আর এইখানে পুনরায় আসবে কিনা। তবে এইমুহুর্তে তার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে। একজন পতিতার সাথে রাত কাটানোর অপরাধে দুনিয়ার চোখে হয়তো সে অপরাধী। কিন্তু সে জানে, সে এইখান থেকে একা যাচ্ছেনা। সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে ছোটবেলার হারানো অপূর্ণ ভালবাসা, একজন প্রতিমার সরলতা আর বিশ্বাসে ভরা ভালবাসা, একরাত শান্তিতে ঘুমানোর তৃপ্তি।

পেছনে হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে কুসুম। সেও আজ অনেক সুখী। কারণ সে জানে যে, এই ছেলেটি আর কোনদিনও অসুখী হবে না। আর কোনদিনও নির্ঘুম রাত কাটাবে না। কেননা গতরাতে চোখ বন্ধ করে, নক্ষত্রদের কাছ থেকে সে এই ছেলেটির সমস্ত সুখ-শান্তি চেয়ে রেখেছে। আজ থেকে আকাশ শান্তিতে ঘুমাবে..................!

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত