শিরোনাম

আমাদের প্রেমের গল্প

জহিরুল ইসলাম  |  ২০:২৭, নভেম্বর ১৭, ২০১৮

২০১০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রথম দেখা, আমার বাবার অফিস icddr,b-এর একটা বনভোজনে। ওর খালামনিও ঐ অফিসে চাকরি করতো, সেই সুবাদে ওরও যাওয়া হয়েছিল। তারপরই আমাদের গল্প শুরু...

আমি জয়, আর আমার ভালোবাসার মানুষটার নাম পুষ্প। আমাদের সম্পর্কটা যখন শুরু হয় তখন পুষ্প পড়তো ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে আর আমি অনার্স ফাইনাল দিয়ে রেজাল্ট এর অপেক্ষায়। তখন icddr,b -এর মিরপুর অফিসে জয়েন করি। আমার বাসা মহাখালী থেকে মিরপুর যেয়ে প্রতিদিন অফিস করতাম। আর ওর বাসা মিরপুর হওয়াতে প্রায়ই অফিস শেষে আমাদের দেখা হতো।

পুষ্পকে যতই দেখতাম ততই অবাক হতাম। অনার্স ফাইনাল দিলেও আমি দেখতে অনেক শুকনা ছিলাম। সবচেয়ে বড় ব্যাপার- আমার উচ্চতা মাত্র ৫' ১’ আর ওরও উচ্চতা ৫' ১’ যা একটা মেয়ের জন্য যথেষ্ট। তারপরও আমার পাশাপাশি ঘুরতে ও কখনও ইতস্তত বোধ করতো না। কখনও যদি এ ব্যাপারটা বলতাম, তখন ও আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতো ‘তুমি দেখতে যেমনই হওনা কেন এর জন্য তো তুমি দায়ী নও। সৃষ্টিকর্তা আমাদের যেভাবে তৈরি করেছেন আমরা তেমনই। এটা নিয়ে একদম মন খারাপ করবে না।’

পুষ্প দেখতে পরীর মতো সুন্দরী তা কিন্তু নয়। গায়ের রং সামান্য একটু শ্যামলা কিন্তু খুব মিষ্টি মায়াবী একটা চেহারা। সে অবশ্যই আমার চেয়ে ভালো-সুদর্শন একটা বয়ফ্রেন্ড পাওয়ার যোগ্য। তবু কেন জানি না মেয়েটা আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। যেদিন বাসা থেকে খাবার না নিয়ে যেতাম সেদিন নিজ হাতে রান্না করা খাবার অফিসে দিয়ে যেত।

আমাদের মধ্যে শুধু ভালোবাসাই ছিল তা নয়, ঝগড়াও হতো অনেক। বেশির ভাগ ঝগড়ার মূল কারণ ছিল- সময় দিতে না পারা। প্রায়ই আমরা অফিস শেষে মিরপুর-১২ সাগুফতা এলাকায় ঘুরতে যেতাম। কাজের চাপ থাকলে মাঝে মাঝে সময় দিতে পারতাম না। তখন ঝগড়া হতো। ওর রাগগুলো ছিল অভিমান আর ভালোবাসা মেশানো। ধীরে ধীরে রাগগুলো অভিমান হয়ে যেত। বড় ঝগড়া হলে ওর সবচেয়ে কাছের বান্ধবী হিনো আমাদের মিলিয়ে দিতো। তাছাড়া আমি তো দেখতে সুদর্শন নই, অন্যভাবে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। তাই অফিসে বসদের সুনজরে পড়ার জন্য মাঝে মাঝে অফিস আওয়ারের পরও কম্পিউটারে কাজ করতাম।

আমি পুষ্পকে বুঝিয়ে বলতাম- ‘দেখো, আমার সাথে যারা চাকরিতে জয়েন করেছেন, ওদের চেয়ে আমি বেশি কাজ করি বলেই তো ওদের চেয়ে ভালো পজিশনে আছি। তুমি কি চাও না আমি আরও বেটার পজিশনে যাই?’ ও ছিল আমার অনুপ্রেরণা।

তবে পুষ্পর ভালোবাসার কাছে আমার ভালোবাসা খুবই নগণ্য। ওর এইচএসসি রেজাল্ট হবার পর শুধু আমার কথা ভেবে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়নি। কারণ আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পাস করা একটা ছেলে। পুষ্প ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হলে ওর পরিবার কোনোভাবেই আমাকে মেনে নেবেন না। তাই ও ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি হলো না।

অনেক বুঝিয়েছিলাম কিন্তু শুনল না। ও ভর্তি হলো মিরপুরের Bangladesh University of Health Science -এর BSC in Laboratory Science. ওর ক্লাসের ছেলেগুলো দেখতে আমার চেয়ে সুন্দর আর স্মার্ট। তবু কখনও ওদের সাথে আমাকে তুলনা করতো না। বরং সবার সাথে আমাকে ওর বয়ফ্রেন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।

২০১১ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ আমার বাবা মারা গেলেন। তখনও আমাকে অনেক সাহস আর সান্ত্বনা দিয়েছিল। ২০১২ এর ডিসেম্বরে চাকরিতে একটা প্রমোশন পেয়ে আমি icddr,b -এর Head Office মহাখালীতে চলে এলাম। সপ্তাহে ২ দিন ছুটি হওয়াতে শুক্রবার-শনিবার দেখা হতো আমাদের। অফিসে কাজের প্রয়োজনে আমি Diploma in Computer Science -এ ভর্তি হলাম। শুক্রবার সারাদিন ক্লাস। সারাদিন দেখা হবে না- এই ভেবে পুষ্পও আমার সাথে ভর্তি হলো।

সময়গুলো খুব ভালোই কাটছিল। ওর 3rd Year শেষ, এবার Internee. সেই সাথে আমাদের Diploma ও প্রায় শেষ। একদিন ও বললো- ‘বাসায় বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে’।

আমাদের মধ্যে সবকিছু ঠিক থাকলেও বাধ সাধলো দুজনার পরিবার। পুষ্পর বাবা দেশের বাইরে। আর ছোট এক ভাই, এক বোন নিয়ে মা থাকেন গ্রামে। ঢাকায় অভিভাবক বলতে খালামনিই সব। ক্লাস সেভেন থেকে উনার কাছে থেকেই পড়াশোনা করেছে পুষ্প। খালামনিকে ও খুব ভয় পায়, তাই আমাদের সম্পর্কের কথা তাকে বলতেও পারছে না। বললাম ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি তো’।

২০১৬ জানুয়ারিতে আরেকটা প্রমোশন হলো, যা ছিল আমার জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট। পুষ্প’র খালামনিও icddr,b তে চাকরি করেন, একদিন সাহস নিয়ে দেখা করলাম। আমাদের সম্পর্কের বিষয়টা পাশ কাটিয়ে অন্যভাবে বললাম যে, আমি তার ভাগ্নিকে পছন্দ করি এবং বিয়ে করতে চাই।

উনি আমার পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন। পুষ্পকে কিভাবে চিনি, তা জিজ্ঞেস করার পর বললাম, ‘পিকনিকে দেখেছিলাম।’ সেদিন উনি কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে পরে জানাবেন বললেন।

খালামনির পর এবার আমার নিজ পরিবার। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে আম্মুকে বললাম। পুষ্প আমার ছোট বোনের সাথে একবার আমাদের বাসায় এসেছিল। তখন আম্মু ওকে দেখেছিল। যতটুকু বুঝলাম আম্মু রাজি নন। আম্মু আপুদের আর বড় দুলাভাইকে জানালো। তারাও রাজি নন। আমার ছোট ভাইয়েরও পুষ্পকে পছন্দ না।

আমার পরিবার যে সমস্যাগুলো দেখালো, সেগুলো এমন ছিল- ‘মেয়ে তো ফর্সা নয়, শ্যামলা গায়ের রং। আমার উচ্চতা কম, তাই বউ অনেক লম্বা হতে হবে। তাছাড়া পড়াশোনা করে সংসার কীভাবে সামলাবে?’ আমি অনেক বুঝালাম- মানুষের গাঁয়ের রং বা উচ্চতাই সবকিছু নয়, মনটাই আসল।

অন্যদিকে পুষ্প’র পরিবারেও আমাকে নিয়ে অনেক নেতিবাচক আলোচনা হচ্ছিল। যেমন:- ‘ছেলে অসুন্দর, খাটো আর শুকনা। ভবিষ্যতে বাচ্চাকাচ্চা হলে ওরাও এমন হবে।’ পুষ্প কিছু না বললেও আমাদের সম্পর্কের বিষয়টা তারা বুঝতে পেরেছিল। পুষ্প’র বাবা আর মামা বিদেশ থেকে দেশে আসলেন। ওকে অনেক কথা শোনালো- ‘পৃথিবীতে কী ছেলের অভাব পড়েছিল যে এই ছেলেকেই পছন্দ হলো!’

পুষ্প মাথা নিচু করে থাকতো আর নীরবে কান্না করতো।আমাদের সমাজে সৌন্দর্য্যের মূল্য কত বেশি, আমরা দুজনেই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ‘অসুন্দর’ এর দোহাই দিয়ে সবাই আমাদের এতদিনের সম্পর্কটাকে ভেঙে দিতে চাইছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত ভালোবাসার কাছে সৌন্দর্য্যের পরাজয় হলো, দুই পরিবারই রাজি হলো।

আমার অফিসের কাজের চাপের কথা বলে বিয়ের তারিখ ঠিক করলাম ২৬ ফেব্রুয়ারি, যা ছিল আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার ঐতিহাসিক দিন। বিষয়টা শুধু পুষ্প আর আমিই জানতাম। বাসর রাতে ব্যাপারটা আমরা দুজনেই খুব উপভোগ করলাম, আমাদের প্রথম দেখা আর বিয়ে একই দিনে। এই ছিল আমাদের প্রেমের গল্প।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত