শিরোনাম

সুরের মূর্ছনায় জমেছিলো সাধুদের মিলনমেলা

প্রিন্ট সংস্করণ॥নজরুল ইসলাম মুকুল, কুষ্টিয়া  |  ০০:৫২, অক্টোবর ১৮, ২০১৮

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১২৮তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাউল ও ভক্ত-শিষ্য, অনুরাগীসহ জনতার ঢল নেমেছিল বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার চত্বরে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া চত্বর উৎসবমুখর ও মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। বাউল-বাউলানি, দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ বিপুল সংখ্যক জনতার পদভারে তিলধারণের ঠাঁই ছিল না লালন আখড়ায়। গতকাল বুধবার সাধুসঙ্গ, অধিবাস, বাল্যসেবা ও পুণ্যসেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সাধু সঙ্গ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধুরা পুণ্য সেবা গ্রহণ করে যার যার এলাকায় ফিরে গেছেন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মাহবুব উল আলম হানিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, অ্যাডভোকেট অনুপ কুমার নন্দী, লালন একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাইজাল আলী খান, অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মাসুম। জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. শাহিনুর রহমান। স্বাগত বক্তা ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তরফদার সোহেল রহমান।
বক্তারা বলেন, লালনের আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে গবেষণা হচ্ছে। ফকির লালন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। তিনি জাতি ও ধর্মে কোনো ভেদাভেদ না করে মানবকল্যাণের জন্য মানবতাবাদী গান গেয়ে গেছেন। এছাড়া তার মানবতাবাদী গানের মধ্যদিয়ে দ্বন্দ্ব ও সকল হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে মানুষে মানুষে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন। তিনি তার জীবদ্দশায় সবসময় সত্যের অনুসন্ধান করে গেছেন। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত লালনের জীবনী ও দর্শন নিয়ে আলোচনা শেষে শুরু হয় লালনগীতির জমকালো সঙ্গীতানুষ্ঠান। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ দেখা দিও ওহে রাসুল ছেড়ে যেও না/ সেই কালাচাঁদ নদে এসেছে/ পারে লয়ে যাও আমারে/ খাঁচার ভিতর অচিন পাখি/ জাত গেল জাত গেল/ মিলন হবে কত দিনে/ কে বানাইল এমন রঙমহল খানা ইত্যাদি গানে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা দারুন মুগ্ধ হন। মরা কালী নদীর পাড়ে লালন একাডেমির মূলমঞ্চে গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও মাজারের চারদিকে একতারার টুং-টাং শব্দ ও নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বাউলশিল্পীরা খ- খ- গানের আসর বসিয়েছিল। এসব গানের আসর দর্শকদের যেন ভিন্নরকম বৈচিত্র্য এনে দেয়। গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও লালন একাডেমি চত্বরের গ্রামীণ মেলায় ছিল উপচেপড়া ভিড়। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কুমারীডাঙ্গা গ্রামের বাউল ফকির আব্দুর রহমান বলেন, প্রতিবছরই সাধক লালনের মৃত্যুবার্ষিকী ও দোল পূর্ণিমার তিথিতে আয়োজিত স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানে এসে সাঁইজির দর্শন ও তার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করি। প্রাণের টানেই লালন মাজারে ছুটে আসি। ফরিদপুর থেকে আগত বাউল ফকির আব্দুল করিম জানান, সাধুসঙ্গ, অধিবাস, বাল্যসেবা ও পুণ্যসেবা গ্রহণের জন্য তিনি প্রতিবছর লালন মাজারে আসেন। মরমী সাধক ফকির লালন গানের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষে মানুষে যে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন তার সেই পথ অনুসরণ করতেই এ মিলনমেলায় তিনি ছুটে এসেছেন। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার বাউল ফকির আব্দুল বাতেন জানান, সাঁইজির মাজার দর্শন, প্রার্থনাসহ মনের প্রশান্তি লাভে লালন আখড়ায় এসেছেন তিনি। সাঁইজির মাজারে প্রার্থনা ও ভক্তির মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি লাভ করা যায় বলে এ বাউল ফকির জানান। উল্লেখ্য, ফকির লালন ছিলেন ভাবজগতের গানের রাজা ও বাউলের শিরোমনি। তার গান মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে দারুণভাবে। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন মৃত্যুবরণ করেন। বাউল ও শিষ্য-ভক্তরা লালন আখড়াকে তাদের তীর্থক্ষেত্র বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন।

লালনের টানে বাংলাদেশে সংসার পাতলেন ফরাসি তরুণী
দেবোরা কিউকারম্যান। ফ্রান্সের নাগরিক। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় তিনি। দেবোরা একজন ভালো ট্রান্সলেটর। দেশে থাকাকালীন ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের কাজও করেছেন। শুধু তাই নয়, দেবোরা দর্শনে এমএ করেছেন। ফ্রান্সে ইয়োগার শিক্ষক ছিলেন।২০১৬ সালে বাংলাদেশে আসার পর বাউল সম্রাট লালন শাহ-এর জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লালন দর্শনের প্রেমে পড়ে যান দেবোরা। আত্মিক শান্তির উদ্দেশে এদেশে এসে গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন। বাউলদের এই জীবনাচারে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন তিনি। বাউল সম্রাট লালন শাহ-এর কথা শুনে কাছ থেকে লালনের জীবন ও দর্শন উপলব্ধি করার জন্য ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম বাংলাদেশে আসেন দেবোরা। এরপর থেকে বসবাস করছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায়। এর মধ্যে কয়েকবার ফ্রান্সে গেছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর বেশি দিন থাকতে পারেননি।কয়েকদিন পরই লালনের প্রেমের টানে আবারো ফিরে এসেছেন লালন ধামে। ফিরে এসে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন এই তরুণী। নাম বদলে হয়েছেন দেবোরা জান্নাত। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় ছেঁউড়িয়ায় চলছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ-এর ১২৮তম তিরোধান দিবস। লালন একাডেমির নিচে হাজারো বাউল-সাধু, শিষ্য-গুরুর সঙ্গে লালন চত্বরে এবার দেখা মিলল ফরাসি তরুণী দেবোরা জান্নাতের সঙ্গে। তিনি প্রখ্যাত বাউল ফকির নহির শাহ-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে মা-বাবার রাখা নামটি পরিবর্তন করে হয়েছেন দেবোরা জান্নাত।
এ বিষয় নিয়ে কথা হয় দেবোরা জান্নাতের সঙ্গে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে প্রথম লালনের দেশ কুষ্টিয়ায় আসি। লালনের গবেষণার জন্য এসে আমি আর ফিরে যেতে পারিনি। মায়া পড়ে গেছে। প্রথমে আমি বাংলা ভাষা জানতাম না। কিন্তু ভাষা না জানলেও আমি গুরুজির সঙ্গে সাধুসঙ্গতে গেলাম। সাধুসঙ্গতে গিয়ে সেখানকার শৃঙ্খলা ও ভাব-বিনিময়ের মধ্যে যে লালন দর্শন পেলাম সেখানে ভাষা কোনো বিষয়ই ছিল না।যেমন কর্ম তেমন ফল উল্লেখ করে দেবোরা জান্নাত বলেন, লালন সাঁইজির দর্শন যারা মানেন, সাধনা করেন, তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে। তবেই সৃষ্টির এই বিস্ময় জানা সম্ভব হবে। ধর্মের চেয়ে সাঁইজির কাছে ছিল মানুষ বড়। ধর্ম কিংবা জাত-পাতের মধ্য দিয়ে নয়, ঈশ্বরকে পেতে হলে, তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে জানা দরকার সুপথের সন্ধান। জান্নাত আরও বলেন, লালন সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই কুষ্টিয়ায় আসা। গুরুজি নহির শাহ-এর কাছ থেকেই শিষ্যত্ব নিয়েছি। আমৃত্যু সাধুসঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশে থাকতে চাই। দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে ফকির নহির শাহ-এর আস্তানায় জান্নাতের বসবাস। কিছু দিন আগে এই আস্তানায় বসবাসকারী নহির শাহ-এর আরেক শিষ্য রাজনকে বিয়ে করেছেন দেবোরা জান্নাত। পেতেছেন সংসার। কারণ হিসেবে দেবোরা জান্নাত উল্লেখ করেন, সংসার হলো সমাজ, সংসার হলো ঘর। এই চিন্তা-চেতনা থেকে ঘর-সংসার করতেই গুরুজির শিষ্যকে বিয়ে করেছি। ফ্রান্সে আর ফিরে যাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে দেবোরা জান্নাত বলেন, আমি শান্তি খুঁজে পেয়েছি এদেশে, এই লালনের প্রেমে। তাই আমি আর ফিরে যাবো না ফ্রান্সে। দেবোরা জান্নাতের বিষয়ে ফকির নহির শাহ বলেন, ফ্রান্স থেকে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আসেন জান্নাত। সত্যের সন্ধানে পৃথিবীর প্রায়ই ১৫টি দেশ ঘুরে অবশেষে বাংলাদেশে এসেছেন। লালন সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করায় একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। পরবর্তীতে দুই সপ্তাহব্যাপী সাধুসঙ্গ করেন। লালন দর্শন সম্পর্কে আলোচনা করেন। তারপর তিনি লালন দর্শনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। লালন দর্শন সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে চাইলে আমি তাকে বাংলা ভাষা শেখার কথা বলি। জান্নাত বাংলা ভাষা শেখার পর তার সঙ্গে আমার ভাব-বিনিময় হয়। আমার দর্শনজ্ঞান ধীরে ধীরে তার মধ্যে দেয়া শুরু করি এবং এখন লালন শাহ-এর দেখানো পথের অনুসারী। লালন সাধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফকির নহির শাহ হলেন দরবেশ লবান শাহ ওরফে আব্দুর রবশাহ-এর শিষ্য। গত ৪০ বছর ধরে লালন দর্শন নিয়ে রয়েছেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত