শিরোনাম

হত্যা না আত্মহত্যা

-রফিক মুহাম্মদ-  |  ০১:১১, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

লাশ! ফ্যানে ঝুলানো। বলেন কি? হ্যাঁ.. হ্যাঁ... হ্যালো...হ্যালো... হ্যাঁ বলুন...ওকে, ওকে...ঠিকানাটা বলুন? আমি এখনি ফোর্স পাঠাচ্ছি। ফোনটা রেখে থানার ওসি সুরেশ চন্দ্র কর্মকার ডাকেন, অবনি অবনি...।
অবনি সরকার পাশেই ছিল। ফোনে ওসির কথা শুনেই সে ঘটনা কি তা অনুমান করতে পারে। না! এত হত্যা, খুন-খারাপি আর ভাললাগেনা।অবনি একা একা বিড় বিড় করে বিরক্তি প্রকাশ করে। গত মাসে সে এ থানায় জয়েন করেছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে হঠাৎ করেই বদলি হয়ে ডিএমপিতে এসেছে। এ থানায় যে দিন অবনি জয়েন করেছে সেদিনই হাতিরঝিলে লাশ পাওয়া গেছে। এরপর মালিবাগ, শান্তিনগর, ইস্কাটন এসব এলাকায় কয়েকটি হত্যা অথবা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে? তবে হত্যা বা আত্মহত্যা যেটাই হোক এতে অবনির মতো সিপাহিদের নাভিশ্বাস অবস্থা। ফায়দা লুটে থানার ওসি-দারগা তারা। আর রাত নেই দিন নেই, খাওয়া- নাওয়া ছেড়ে ডিউটি করে সিপাহিদের জীবন শেষ। অবশ্য এরকম রাতদিন পরিশ্রমে অবনির কোন আপত্তি নেই। শুধু দিনকে রাত আর রাতকে দিন করাটাই তার আপত্তি। এ জন্য তাকে ওসি স্যারের অনেক কথাও শুনতে হয়। অনেক সময় ওসি তাকে অর্ধ বরিশালের ভাষায় বেশ অবজ্ঞা করে বলেন, ও মনু, এত নীতি নিয়া তুই চাকরি হরতে আইছো ক্যা? পুলিশে চাকরি হরবা আর হাতে তসবি টানবা হেইআ তোমারে কেডা কইছে? তুই বেডা বরিশ্যাইল্ল্যা অপদার্থ? চাকরি ছাইড়া তবলিগে যাওগা বুচছ মনু? সত্যি এ চাকরি ছেড়ে অবনির চলে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু অসুস্থ বাবা, বৃদ্ধা মা এবং ছোট ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে তা আর পারে না। পুলিশ জনগণের বন্ধু এমন বিশ্বাসকে বুকে নিয়ে অবনি চাকরিতে জয়েন করেছিল। এখন দেখছে তার উল্টো। অবশ্য সবাই যে ওসি সুরেশ চন্দ্রের মতো তা তো নয়। জনগণের বন্ধু অনেক অফিসারই আছেন। এই যেমন হালুয়াঘাটের ওসি জুবায়ের স্যার। তার মতো এমন ভালো মানুষই হয় না। কোনো রকম অন্যায়ের সাথে তিনি আপোস করেন না। সরকারি দলের এমপির লোকেরাও এলাকায় মেলার নামে জুয়ার আসর বসাতে পারেনি। জুবায়ের স্যাার এমপি সাহেবের ধমকেও অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। তাকে বান্দরবানে বদলির হুমকি দেওয়া হয়েছে। এসব হুমকি ধামকি কিছুই জুবায়ের স্যারকে তার কর্তব্য কাজ থেকে সরাতে পারেনি। স্যার অনেক সময় হাসতে হাসতে বলেছেন, জান অবনি আমাকে বান্দরবানে বদলির ভয় দেখায়। আরে চাকরিতে যেদিন জয়েন করেছি সেদিন তো বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে দায়িত্বপালনের শপথ নিয়ে জয়েন করেছি। বান্দরবান তো খব সুন্দর জায়গা। মানুষতো সেখানে বেড়াতে যায়। আমাকে সেখানে বদলি করলে তো ভালই হয়। তাছাড়া এভাবে ক’দিন পর পর বদলি করলে সরকারি খরচে সারাবাংলাদেশটাও দেখা হবে কি বলো? অবনি শুধু হেসেছে। আর এখানে এসে সে আর এমন প্রাণখোলা হাসি হাসতে পারছেনা।
এ থানায় জয়েন করার ক’দিন পরেই ইস্কাটনে একটি ফ্ল্যাটে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। সে দিন সারারাত ৬ তলার ফ্ল্যাটে অবনিসহ আরও দু-জন সিপাহি লাশ পাহারা দিয়েছে। কি সুন্দর মেয়েটি। বয়স বিশ পঁচিশের মতো হবে। গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো। ঘনকালো চুলে ঘেরা মুখটা কি মায়া মাখা। তার নিথর দেহের এই মুখটা দেখে খুব মায়া হয়। অবনি মেয়েটির লাশটা বেশ ভালো করে লক্ষ্য করে। মেয়েটির গলায় হার, কানে দুল, নাকে নাকফুুল ঝলমল করছে। ভালো করে লক্ষ্য করে অবনির মনে হয়েছে মেয়েটি পোয়াতি। ঠোটের কোন বেয়ে খয়ের দিয়ে পান খাওয়া রঙের মতো সরু রক্তের দাগ লেগে আছে। মেয়েটিকে গলাটিপে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছেঅবনি এ বিষয়ে নিশ্চিত।
সকালে লাশ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পাঠিয়ে অবনি থানায় যায়। ঘটনা সম্পর্কে জানতে ওসি সাহেব তখন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, অবনি বলতো ঘটনা কি? খুনকে হয়েছে, পুরুষ না নারী?
: জী স্যার, খুন হয়েছে একজন অল্প বয়সী সুন্দরী মেয়ে।
: প্রেম ঘটিত, নাকি পারিবারিক, কিছু কি বুঝতে পেরেছো?
: না স্যার, ওরকম কিছু বুঝতে পারিনি? তবে আমার মনে হয় মেয়েটি খুব সম্ভবত গর্ভবতী।
: বলো কি? তাহলেতো জোড়া খুনের ঘটনা। ডাবল মার্ডার। ওসি কিছুটা উত্তেজিত হয়ে এবার বলেন, তা এই গর্ভবতী মেয়েটি কি বিবাহিত? নাকি বিয়ের আগেই পেটে বাচ্চা আসায় তাকে হত্যার শিকার হতে হলো।
: জী স্যার!
: আসলে বড় লোকদের ফ্যামিলিতে এ ধরনের অবাঞ্ছিত গর্ভধারনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তাই বলে এ নিয়ে হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা খুব একটা ঘটে না। ক্লিনিকে গেলেই এর সহজ সমাধান হয়ে যায়। এ ধরনের ঘটনায় নিম্নœ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরকে জীবন দিতে হয়। পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে মেয়েটি নিজেই আত্মহত্যা করে অথবা বেঈমান প্রেমিক পিতৃত্বের দায় থেকে মুক্ত হতে প্রেমিকাকে হত্যা করে। এ কেসটা কোন ধরনের? : স্যার আমার তো মনে হয় মেয়েটিকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। ঠোটের কোণ রক্তের রেখা বেশ স্পষ্ট দেখেছি।
: হতে পারে, তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার আগে তুমি এভাবে নিশ্চিত করে বলতে পারো না যে মেয়েটিকে হত্যা করা হয়েছে। অ-মনু বুচছ, এই রহম হরলে মোর চাকরিও যাইবে বুঝলা?
এ সময়ে থানায় একটা পাজেরো জিপ ঢুকে। তিন চারজন যুবক জিপ থেকে নেমে সোজা ওসি সাহেবের রুমে ঢুকে পড়ে। ওসি সাহেব ওদের একজনকে চিনতে পেরে লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলেন, আরে রনি ভাই আপনি। আমাকে ফোন দিলেই হতো, পার্টি অফিসে আমি চলে যেতাম।
: আরে না, সুরেশ দা, অন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছি। গতকাল রাতে ইস্কাটনে আমার বড় বোনের ফ্ল্যাটে...। এটুকু বলেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবনির দিকে তাকায়। ওসি সাহেব বুঝতে পেরে বলেন, অবনি তুমি এখন যাও। আর হ্যাঁ করিমকে চা বিস্কুট দিতে বলো। অবনি বেরিয়ে যাওয়ার ত্রিশ পয়ত্রিশ মিনিট পর ওসি সাহেবের রুম থেকে লোকগুলো বেরিয়ে যায়। ওসি নিজে দরজা পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দেয়। এরপর অবনিকে ডেকে ওসি সাহেব ঠোটের কোনে হাসির ঝিলিক ঝুলিয়ে বলেন, অবনি গতরাতে ইস্কাটনের ঘটনাটা স্রেফ আত্মহত্যা বুঝলে?
: স্যার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট...।
: ও মনু বেশি বুইজ্জ্য না। তুই কি আমারে চাকরি হারাইতে কও। যা কইছি হেইআই কইবা বুচছ?
: জী স্যার...।
বিষয়টি অবনিকে খুবই কষ্ট দিয়েছিল। তবে এ কষ্ট ভুলতে না ভুলতেই আট দশ দিন পরতাকে এরচেয়েও আরও ভয়াবহ ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। ওসি সুরেশ চন্দ্র হঠাৎ তাকে ডেকে বলেন, অবনি সন্ধ্যার পর আজ কাকরাইল এলাকায় ফাঁদ পাততে অইবে।
: জী স্যার, জী...ফাঁদ মানে...। বুঝতে না পেরে অবনি জী স্যার জী স্যার বলে আমতা আমতা করে।
: ও মনু ফাঁদ বুঝনা, তুই পলিশে চাকরি হর কেমনে। ফাঁদ অইলে ক্রিমিনাল ধরার চেক পোস্ট বুচ্ছ? মাইয়াডা ইন্ডিয়ায়তে আর পোলাডা মালয়েশিয়া পড়তাছে। টাহা পয়সাতো লাগে নাহি? ওই টাহা দিব কেডা।
: স্যার...স্যার..। ওসির ভৎসনায় কিছু না বুঝেই অবনি শুধু জী স্যার জী স্যারকরে। তবে কাকরাইল এলাকায় চেক পোস্ট বসিয়ে রাত দশাটার দিকে যখন এক যুবককে রিকশা থেকে নামিয়ে তল্লাশির নামে তার পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়া হয় তখন অবনি থ হয়ে যায়। সে বিষ্ময়ের সাথে বলে স্যার একি করছেন স্যার...। ওসি সুরেশ তখন ওকে ধমক দিয়ে বলে, এ তুমি বুঝবা না। শুধু দেখ। এর পর আরও কত কিছু ঘটবে। এই শালা মাদকের ব্যবসা করে, ওর পকেটে ইয়াবা দেখছ। থানায় নিয়া চল, দেখবা ব্যবসার সব খবর বাইর অইয়া যাইবে। এরপর ছেলেটাকে সারারাত থানায় আটকে রেখে কি যে টর্চার করা হয়েছে, মনে হলে অবনির শরীর এখনো শিহরিয়া উঠে। সকালে অভিভাবকরা এসে দুই লাখ টাকা দিয়ে ছেলেটাকে ছাড়িয়ে নেয়। ওসি সুরেশ অবনিকে সেখান থেকে দশ হাজার টাকা দিয়েছিল। অবনি তা নেয় নি। ওই ঘটনায় ভিতরে ভিতরে কি যে কষ্ট পেয়েছে তা বলে বুঝাতে পারবে না। ওইদিন ভেবে ছিল ওসির মুখে ঘৃণার থু থু দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাবে। শেষ পর্যন্ত অবনি তা করতে পারেনি।
আজ আবার কে জানি খুন হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই ওসির দু’চোখ খুশির ঝিলিক খেলা করে। অবনি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করার কথা বলে ভাবতে থাকে, আজকেও হয়তো গিয়ে দেখবে কোন সুন্দরী তরুণীকে গলাটিপে হত্যা করে গলায় ওড়না পেছিয়ে ফ্যানে ঝুলিয়ে রেখেছে। আর ওসির ঝিলিক দেওয়া চোখে হয়তো সেটি আত্মহত্যা বলেই ধরা পড়বে? শালার এই চাকরি...। অবনি মনে মনে নিজেই নিজেকে গালি দেয়। ওর ভাবনার মধ্যে থানায় একটি গাড়ি ঢুকে। চারজন গাড়ি থেকে নেমে সোজা ওসির রুমে ঢুকে। কি হবে সেটা অবনির বুঝতে আর বাকি থাকে না। প্রায় আধ ঘন্টা পর লোকগুলো বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওসির রুমে অবনির ডাক পড়ে। ওসির ঠোটের কোনে সেই হাসির ঝিলিক। অবনির দিকে না তাকিয়ে বলেন, ও মনু বুচ্ছ? এইডাও আত্মহত্যার ঘটনা। লাশটা মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা হর, যাও। মথা নিচু করে অবনি বেরিয়ে আসে।
বাবা অসুস্থ খবর পেয়ে অবনি ছুটি নিয়ে গতকালই বাড়ি এসেছে। সকালে গ্রামের বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে ঢুকে টিভির দিকে তাকিয়ে অবনি থ হয়ে যায়। গ্রামের বাজারে ডিশ লাইন থাকায় এখানের চায়ের দোকানগুলোতে সারক্ষণই টিভি চলে। টিভিতে ব্রেকিং নিউজটা দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অবনি একটু এগিয়ে টিভি স্কিনের কাছে গিয়ে পড়ে, গত রাতে কাকরাইল এলাকায় একটি ট্রাককে ধাওয়া করে আটকাতে গেলে ওসি সুরেশ চন্দ্র কর্মকারকে ট্রাকের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে জীবন দিতে হলো...। অবনির মনে মুহূর্তেই প্রশ্ন জাগে এটি হত্যা না আত্মহত্যা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত