শিরোনাম

২০১৭ সালে নোবেল পেলেন যাঁরা

আমার সংবাদ ডেস্ক  |  ১৭:৪০, অক্টোবর ০৯, ২০১৭

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে তার উপার্জিত অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার হিসেবে দিতে একটি উইল করে যান। ১৯০১ সাল থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দিয়ে আসছে নোবেল কমিটি।নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে শুধু শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। বাকি পুরস্কার ঘোষণা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিষয়গুলো হল- পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি। শান্তি নোবেল পুরস্কারকে এ সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদেরকে ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়।

প্রত্যেক বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেক একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৮০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। নোবেল পুরস্কার মৃত কাউকে দেয়া হয় না। লরিয়েটকে অবশ্যই পুরস্কার প্রদানের সময় জীবিত থাকতে হবে। কিন্তু এর কিছু ব্যতিক্রম আছে। খুব বেশি অবদান এর জন্য মরনত্তোর পুরস্কার দেয়া হয়। অসাধারণ অবদান রাখার জন্য প্রতি বছর এই ছয়টি (পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি) ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। বরাবরের মতো ২০১৭ সালেও ছয়টি ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেয়েছেন তিন মার্কিন বিজ্ঞানী:
রেইনার ওয়াইস, ব্যারি সি ব্যারিশ ও কিপ এস থর্ন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করার জন্য পদার্থবিদ্যায় ২০১৭ সালের নোবেল পুরস্কার পেলেন৷ তিন বিজ্ঞানী ‘লিগো' বা ‘লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি' প্রকল্পে বিশেষ অবদান রাখেন৷ পুরস্কারের অর্ধেক পাচ্ছেন ওয়াইস; ব্যারিশ ও থর্ন মিলে অবশিষ্ট অর্ধেক৷ একশ' বছর আগে আইনস্টাইন তাঁর ‘জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি'র অঙ্গ হিসেবে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা বলেন৷ সেই মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের চূড়ান্ত হদিশ পাওয়া যায় মাত্র দু'বছর আগে, ২০১৫ সালে৷ অ্যাকাডেমির প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই তিন বিজ্ঞানী ‘‘প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, চার দশকের প্রচেষ্টার পর অবশেষে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে৷'' নোবেল পুরস্কার লাভের কথা জানার অব্যবহিত পরে রেইনার ওয়াইস বলেন, ‘‘এটা সত্যিই দারুণ৷'' পদার্থবিদ্যায় যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার জয়ের খবর পেয়ে অভিভূত ব্যারিশ বলেন, নোবেল অ্যাকাডেমির এই ঘোষণা ‘‘আইনস্টাইনের জন্য একটি জয় এবং একটি বিরাট জয়৷''ডিনামাইটের সুইডিশ আবিষ্কর্তা আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে নোবেল পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করেন৷ পুরস্কারের বর্তমান মূল্য হল ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার অর্থাৎ প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার ইউরো বা ১১ লাখ ডলার৷তিনজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী – ডেভিড জে দাউলেস, এফ ডানকান এম হ্যালডেন ও জে মাইকেল কস্টারলিট্জ – সুপারকন্ডাক্টর ও সুপারফ্লুইডের মতো বস্তুর কর্মপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে টোপোলজি বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করে পদার্থবিদ্যায় ২০১৬ সালের নোবেল পুরস্কার লাভ করেন৷ গত ২৫ বছর ধরে পদার্থবিদ্যায় একাধিক বিজ্ঞানী নোবেলে ভূষিত হয়ে আসছেন৷

রসায়নে নোবেল পেলেন ৩ মলিকিউল গবেষক:
২০১৭ সালে রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন জ্যাকুস ডুবোশেট, জোয়াচিন ফ্র্যাংক ও রিচার্ড হেন্ডারসন। সুইডিশ নোবেল কমিটির বক্তব্যে বলা হয়, তারা মলিকিউল নিয়ে গবেষণায় সাফল্যের জন্য এই পুরস্কার জিতেছেন। এতে শুধু তাদের কাঠামোই নয়, ছবিও মানুষের বোধগম্য হয়েছে ঠিক যেন মুভির মতো। নোবেল কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তারা বায়োমলিকিউলস-এ ক্রায়ো-ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কপি বিষয়ে গবেষণায় সাফল্যের জন্য এ পুরস্কার পেলেন। তাদের অবদান রসায়ন শান্ত্রকে ভিন্নতর উচ্চতায় পৌঁছে দেবে। সুইডেনে একটি সংবাদ সম্মেলনে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বিজয়ীরা ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক জনের তালিকায় যুক্ত হলেন

চিকিৎসায় নোবেল পেলেন ৩ মার্কিন বিজ্ঞানী:
শরীরবৃত্ত ও ভেষজবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার জয় করলেন জেফ্রি সি হল, মাইকেল রসব্যাশ ও মাইকেল জে ইয়ং৷ শরীরের ‘বায়োলজিক্যাল রিদম’ নির্ধারণ করে এমন একটি জিন শনাক্ত করে এ পুরস্কার পেলেন তাঁরা৷ ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি হল, রসব্যাশ ও ইয়ং-কে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করলেন, কেননা, যে মলিকিউলার মেকানিজম শরীরের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ নিয়ন্ত্রণ করে, এই তিন গবেষক তা আবিষ্কার করেছেন৷ ‘‘উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানব শরীর কিভাবে তাদের দৈনন্দিন কর্মচক্রকে দিবারাত্রির ছন্দের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়,’’ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার থেকে তার ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে বলে নোবেল অ্যাসেম্বলির তরফ থেকে পুরস্কার ঘোষণার সময় বলা হয়৷

অর্থনীতিতে নোবেল জিতলেন রিচার্ড এইচ থ্যালার:
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আমেরিকান প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ রিচার্ড এইচ থ্যালার। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মনস্তত্ত্বের প্রভাব বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল জিতেছেন। ৭২ বছর বয়সী মার্কিন এই অর্থনীতিবিদ ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট অরেঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। থ্যালার যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর আচরণগত বিজ্ঞান ও অর্থনীতির অধ্যাপক। থ্যালার জানিয়েছেন, তার কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে, অর্থনীতির এজেন্ট হিসেবে মানুষের স্বীকৃতি। যা অবশ্যই অর্থনীতির বিভিন্ন মডেলের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রিচার্ড এইচ থ্যালার অর্থনীতির বাইরে হলিউডেও বেশ পরিচিত। ‘দ্যা বিগ শর্ট’ নামের একটি অর্থনীতি বিষয়ক সিনেমাতেও তিনি কাজ করেছেন। এ সিনেমায় তিনি আচরণগত অর্থনীতির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। যার মধ্যে তার নোবেল পাওয়া কাজও ছিল।

সাহিত্যে নোবেল জিতলেন কাজুও ইশিগুরো:
২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ব্রিটিশ সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো (৬৩)। জাপানি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ লেখকের জন্ম জাপানের নাগাসাকিতে ১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর।১৯৬০ সালে ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার এবং ছোট গল্প লেখক কাজুও-র বয়স যখন ৫ বছর তখন তার পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসে। ইশিগুরোকে নোবেল বিজয়ী ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি জানায়, তার অসাধারণ আবেগময় উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগে তিনি আমাদের অপার্থিব অনুভূতির গভীরতম প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এর আগে ১৯৮৯ সালে ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসের জন্য তিনি ‘ম্যান বুকার’ পুরস্কার পেয়েছিলেন। গত বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলান। যুক্তরাষ্ট্রের সংগীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক ধারা সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে ডিলানকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয় বলে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো। তবে ডিলানের নোবেল পুরস্কার নিয়ে অনেক নাটকীয়তা হয়েছিল। পুরস্কার ঘোষণার পর এ নিয়ে কোন মন্তব্য করেননি তিনি। স্টকহোমে গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নোবেল পুরস্কার হস্তান্তর অনুষ্ঠানে যাননি তিনি। কেবল একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানের তিন মাসেরও বেশি সময় পর নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন ডিলান। এর আগের বছর ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ নামের একজন নারী সাংবাদিক। বেলারুশের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি এবং প্রথমবারের মতো সাংবাদিক হিসেবে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। সোভিয়েত যুগের আনবিক দূষণ নিয়ে ডকু-ফিকশন ‘এ মনুমন্টে টু সাফারিং অ্যান্ড করেজ ইন আওয়ার টাইম’ বইয়ের জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। ১৯০১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাহিত্যে ১১৪ জনকে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন ১৪ জন নারী। দুইজনকে যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে এমন ঘটনা ঘটেছে ২ বার। সাহিত্যে নোবেল পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং। ৪১ বছর বয়সে ‘দ্য জাংগল বুক’ এর জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। আর সাহিত্যে নোবেলজয়ী সর্বোজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি হলেন ডোরিস লেসিং। ২০০৭ সালে যখন লেসিংকে পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা করা হয় তখন তার বয়স ছিল ৮৮ বছর।

শান্তিতে নোবেল পেল পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠন আইসিএএন:
পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইসিএএন) ২০১৭ সালে শান্তিতে নোবেল জিতে নিয়েছে। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচারণার স্বীকৃতি হিসেবে তারা এ সম্মানজনক পুরস্কারটি পেয়েছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির প্রধান বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসন বলেন, ‘পরমাণু অস্ত্রের কোন প্রকার ব্যবহারের ফলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কর পরিণতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ এবং এই ধরণের অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি চুক্তিভিত্তিক নিষিধাজ্ঞায় পৌঁছাতে এর (আইসিএএন) অসাধারণ প্রচেষ্টার স্বীকৃতিতে এই গ্রুপকে পুরস্কারটি দেয়া হয়েছে। পরমানু অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে আইসিএএন। ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয় করেছিলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস।বহুল প্রত্যাশিত একটি শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রায় ৫২ বছরের রক্তাক্ত সংঘাতের ইতি টানার জন্য তিনি এই স্বীকৃতি পান।কলম্বিয়ায় ৫২ বছরের ওই সংঘাত ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।এর আগের বছর ২০১৫ সালে শান্তিতে নোবেল পান তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা সংগঠন ‘তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত