শিরোনাম

শেষের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ

রেজাউল আহসান  |  ২০:১৯, আগস্ট ০৭, ২০১৭

শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে কিছু নতুনত্ব দেখা যায়। আর তার নতুনত্বের আরেক আনজাম শেষের কবিতা উপন্যাস। শেষের কবিতায় আধুনিক অভিজাত্য সমাজের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের মেলবন্ধনের কথা এসেছে, এসেছে বিচ্ছেদ ও বিরহের কথা। লেখার কলমের সাথে চিত্রকল্পকে দেখার এক ধরনের গভীর অনুভূতি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় উপলব্ধি করা যায়। যেখানে একেকটা বক্তব্যের সাথে আরেকটা বক্তব্যের বিষয়গুলো যেন বারবার কল্পনার চোখে দৃষ্টিত হয়। শেষ জীবনে এসে রবীন্দ্রনাথ দু’জন মানব-মানবীর প্রেমের কাহিনী লিখলেন। তাও এ কোন সররৈখিক প্রেম নয়, এ প্রেম চতুর্ভুজাকৃতির। আর ব্যক্তিটা যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তার জন্য এ আর এমন কি! রবীন্দ্রনাথ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছলেন তখনই তার হাতে রচিত হলো কালজয়ী উপন্যাস, ‘শেষের কবিতা’। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গত ৯০ বছরের মতো সময়ে, একই জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক পাঠ্যবহুলতার মধ্যে রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের খুব কম বই-ই এমন জনপ্রিয়তার কাতারে পৌঁছাতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ তার সৃষ্টিতে, শিল্পে, কাব্যময়তায় এক ও অনন্য। শেষের কবিতায় তিনি যে ভাষার ব্যবহার ঘটিয়েছেন তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারারই উন্মেচক।
যেমন- ‘ফ্যাশনটা হলো মুখোশ, স্টাইল মুখশ্রী।’ বর্তমানে আমরা ফ্যাশন ও স্টাইল সম্পর্কে নতুন ভাবে জানছি ও জানাচ্ছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ৯০ বছর আগেই সেসব ব্যবহার করেছেন শেষের কবিতায়। আবার বলেছেন, ‘লোকে ভুলে যায় দাম্পত্যটা একটা আর্ট-প্রতিদিন তাকে নতুন করে সৃষ্টি করা চাই।’ দাম্পত্যকে আর্টের সাথে তুলনা করে দাম্পত্যের সম্পর্ককে আরো বেশি গতিময় করেছেন। প্রমিত বাংলা ভাষায় রচিত চমৎকার বাক্যাবলির সুসংমিশ্রণ শব্দের আদলে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছেন। যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, বিচ্ছেদ আছে, কাব্যিক ছন্দময়তা আছে, হাস্যরস আছে। অমিতর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ শেষের কবিতায় আমরা যেন জীবন্ত রবীন্দ্রনাথকেই দেখতে পাই। শেষের কবিতার ভাষাগত শৈলী অপূর্ব। যেন এক শব্দের পর আরেক শব্দ শোনার অপেক্ষা। গদ্য সাহিত্যের মধ্যেও যে ছন্দময়তা থাকতে পারে, তা শেষের কবিতার মধ্যে দিয়েই প্রথম প্রমাণ হয়।
অমিত উপন্যাসের নায়ক। অমিতর এই চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক বিমূর্ততায় সাজিয়েছেন। বলতে গেলে সম্পূর্ণ উপন্যাসটিকে সে একাই টেনেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়ালে সব দেবতাকেই সেসব দেবতার চেয়ে বড়ো বলে স্তব করে; দেবতাদের বুঝতেও বাকি থাকে না অথচ খুশিও হন। কন্যার মাতাদের আশা কিছুতেই কমে না, কিন্তু কন্যারা বুঝে নিয়েছে অমিত সোনার রঙের দিগন্ত রেখা- ধরা দিয়েই আছে তবু কিছুতেই ধরা দেবে না। মেয়েদের সম্বন্ধে ওর মন তর্কই করে, মীমাংসায় আসে না। সেই জন্যেই গম্যবিহীন আলাপের পথে ওর এত দুঃসাহস। তাই অতি সহজেই সকলের সঙ্গে ও ভাব করতে পারে- নিকটে দাহ্যবস্তু থাকলেও ওর তরফে আগ্নেয়তা নিরাপদে সুরক্ষিত।’
শিলঙ পাহাড়ে অমিত ও লাবণ্য যখন একসাথে ঘুরতে গেল তখন অমিত লাবণ্যকে একটা ছ্যাৎলা পড়া পাথরের মধ্য বসতে অনুরোধ করলে লাবণ্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু সময় যে অল্প।’
অমিত বলল, ‘জীবনে সেটাই তো শোচনীয় সমস্যা লাবণ্যদেবী, সময় অল্প।... সময় যাদের বিস্তর তাদের পাঙ্কচুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্কচুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা।’
সম্পর্কের এক পর্যায়ে এসে লাবণ্য বুঝতে পেরেছিল, অমিতকে সে হয়তো জীবনে আর পাবে না। তাই তো সে বলেছিল, ‘তুমি আমার যত কাছেই থাক তবু আমার থেকে তুমি অনেক দূরে।’
মুক্তি পর্বে অমিত লাবণ্যকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে কিন্তু লাবণ্যের মনে তেমন কোনো সাড়া নেই। অমিত নানাভাবে ওকে আগলে রাখছে কিন্তু লাবণ্য যেন শান্ত ও নিবিড়। কেতকির হাত থেকে আংটি খুলে অমিত একদিন লাবণ্যকে পরিয়েছিল আজ লাবণ্য সে আংটি খুলে আমিতের আঙুলে আস্তে করে পরিয়ে দিলো। আর বললো, ‘আমাকে তুমি কোনো আংটি দিয়ো না। কোনো চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই। আমার প্রেম থাক নিরঞ্জন। বাইরের রেখা- বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।’ তাতে অমিতও কোনো বাধা দিলো না।
অন্যদিকে, লাবণ্যের বাল্যবন্ধু শোভনলাল লাবণ্যকে চিঠি দিয়ে জানাল সে, শিলঙে এসেছে। লাবণ্যও চিঠির প্রত্যুত্তর দিলো। এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক ঠেকল বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত। অতঃপর যতি শংকর লাবণ্যের লেখা একটি চিঠি এনে অমিতের হাতে দিল। এর এক পৃষ্ঠায় ছিল লাবণ্য ও শোভনলালের বিয়ের খবর অন্য পৃষ্ঠায় একটি সুদীর্ঘ কবিতা এবং সেটাই হলো শেষের কবিতা। যতিশংকরের হাত থেকে লাবণ্যের চিঠি পাওয়ার পরও অমিতের মধ্যে তেমন কোনো পতিক্রিয়া দেখা যায়নি। যেখানে শোভনলালের সাথে ছয় মাস পরে লাবণ্যের বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে।
শেষের কবিতার শেষে লাবণ্য লিখছে,
‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।’
অমিতর ভালোবাসার সকল দানকে লাবণ্য অকোপটে স্বীকার করে নিল। ভালোবাসার দায় যে মানুষকে ঋণী করে সে কথাই যেন এই লাইনের মাধ্যমে লাবণ্য জানান দিলো। অমিতর কথায়, ‘মন যখন খুব বড় হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।’ লাবণ্য যুদ্ধ করে অমিতের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে আর আজ যখন মন খুব উদার তখন অকপটে সব কিছু স্বীকার করে নিলো অর্থাৎ ক্ষমা করে দিল।
রবীন্দ্রনাথ, ‘মানসী’তে বলেছিলেন, ‘মিলনে প্রেম ম্লান হয়।’ হয়তো তিনি প্রেমকে ম্লান করতে চাননি বলেই অমিত ও লাবণ্যের প্রেমকে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে অম্লান করে রেখেছেন। শেষের কবিতা উপন্যাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তার যৌবনকালের ব্যক্তি মানসের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, ফিলোসফি ও তার রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সমস্ত উপন্যাস-জুড়েই নানা আদলে জীবন্ত রবীন্দ্রনাথই যেন আমাদের কাছে ধরা দেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত