দেশি-বিদেশি সাহিত্য অঙ্গনের মিলন মেলা

প্রিন্ট সংস্করণ॥সৈয়দ রেফাত | ১১:৩১, নভেম্বর ১৯, ২০১৬

 

১৯৮৮ সালের মে-জুন মাসে ‘হে-অন-ওয়ে’ শহরেই শুরু হয় ‘হে ফ্যাস্টিভ্যাল’। গত ২৯ বছরে ‘হে ফ্যাস্টিভ্যাল’ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় এখন চলছে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’-এর পাইলট প্রোগাম ঢাকা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল। সংক্ষেপে ঢাকা লিটফেস্ট। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিশ্বময় পরিচিত করার লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি চত্বরে ‘ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল’-এর ব্যানারে ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশি-বিদেশি সাহিত্য অঙ্গনের মিলন মেলা।

গত বৃহস্পতিবার এটির উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল। এ সাহিত্য উৎসবে ১৮টি দেশ থেকে ৬৬ জন বিদেশি এবং দেড় শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন। দেশি-বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সরাসরি সাহিত্যসহ সমাজের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনায় অংশ নিয়েছেন জনসাধারণ। ১৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে আজ ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত। ৩ দিনব্যাপী এই উৎসবে বিদেশি লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেশের প্রবীণ তরুণ লেখক-পাঠকদেরও মিলন ঘটেছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ উদযাপিত হয় বিশেষ করে কাজী আনিস আহমেদ ও তাহমিমা আনামের উদ্যোগে।

বিগত কয়েক বছরের ন্যায় এ বছর কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ ও আহসান আকবারের পরিচালনায় এবারের আয়োজনে দেশে-বিদেশের লেখকের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। তিন দিনে বাংলা একাডেমির নবনির্মিত ভবনের ড. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ হলকে প্রধান মঞ্চ, পাশেই কবি শামসুর রাহমান হলকে কে কেটি মঞ্চ, ড. এনামুল করিম ভবনের ভেতরে ব্রাঞ্চ মঞ্চ, বর্ধমান হাউসের উত্তরের প্রাঙ্গণকে বর্ধমান হাউস মঞ্চ, দক্ষিণকে লন, বটতলা মঞ্চ এবং পুকুরের পাশে তাঁবু করে কসমিক টেন্ট করে স্থায়ী-অস্থায়ী মোট সাতটি মঞ্চে ১০০টি পর্বে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে প্রথম দিন ২৩টি, দ্বিতীয় দিন ৩৮টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয় এবং তৃতীয় দিন (আজ) ৩৯টি পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।

এ বছরে আয়োজনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ট্রিনিডাড এন্ড টোবাগোর লেখক-ঔপন্যাসিক ভি এস নাইপল। সাহিত্য পুরস্কারের জগতে সবচেয়ে সম্মানজনক নোবেল প্রাইজ ও ম্যান অফ বুকারসহ বিশ্বের বহু পুরস্কার ভূষিত তিনি। উপনিবেশ আর নির্বাসন নিয়ে রচিত তাঁর হাউস অফ মি. বিশ্বাস উপন্যাসকে ‘টাইম’ ও ‘দ্য নিউইয়র্ক বুক রিভিউ’ ম্যাগাজিন অভিহিত করেছেন ইংরেজি গদ্য সাহিত্যের ‘নতুন দ্রষ্টা’ ও ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে।

পরবর্তীকালে নিজের ন্যারেটিভের প্রকৃতি নানাভাবে পালটে নিলেও, মূলত ছোট জায়গা থেকে মুক্তি, সংকীর্ণ অস্তিত্ব থেকে মুক্তি, থেমে যাওয়া থেকে মুক্তির কথাই বলে গেছেন নিরন্তর স্যার নাইপল। বাংলাদেশে এটাই তার প্রথম সফর। এছাড়া তিনদিনের এই সাহিত্য উৎসবে দু’শতাধিক শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিকসহ আরও অনেকে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী ও ২০১৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রাইজ ফর লিটারেচার ইভ উইল্ড জয়ী ডেবোরাহ স্মিথ, উত্তর কোরিয়ার লেখক হাইয়েনসিও লিসহ নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশের সাহিত্যিকরা এই লিট ফেস্টের আসর মাতাচ্ছেন।

সাহিত্য সর্বগামী, সবার জন্য
লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনে সাহিত্যের এই সেশন নিয়ে আলোচনায় বসেন, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, ভারতীয় প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক সংগীতা বন্দোপাধ্যায় এবং ইমতিয়ার শামীম। সঞ্চালনায় ছিলেন আন্দালিব রাশদি। আলোচনার মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসে সাহিত্য সবার জন্য কি না?

সাহিত্য যখন সবার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইমদাদুল হক মিলন বলেন, সাহিত্য যে সবার তা আমি মনে করি না। কারণ, বাংলাদেশের সতেরো কোটি মানুষের যদি এক শতাংশ মানুষও যদি সাহিত্য পড়তো, তবে মানসম্পন্ন বইগুলোর বিক্রি বেড়ে যেত। বাংলাদেশের বড় সাহিত্যিকদের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের মানসম্পন্ন কতগুলো লেখা আমাদের খুব কাছে পৌঁছতে পেরেছে এটি ভাবার বিষয়। সুতরাং, সাহিত্য সর্বগামী বা সাহিত্য সবার জন্য, তা আমি প্রকৃত অর্থে মনে করি না।

সঙ্গীতা বললেন ভিন্ন আঙ্গিকে। তিনি বলেন, সাহিত্য সবার জন্য না বলা মুশকিল। লিখিত সাহিত্য ছাড়াও যুগ যুগ ধরে যে গান, কথা তৈরি হতো তা কি সাহিত্য নয়। সেই অর্থে সাহিত্য অনেক বেশি সার্বজনীন। আর সাহিত্যের শুরু ভালোবাসা থেকেই- এটা আমার বিশ্বাস।

কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম বলেন, লেখক মূলত লেখে নিজের জন্যই, পরে সেটা পাঠকের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। তাই সাহিত্য সবার জন্য হয়ে ওঠাটা জটিল। আমাদের মত দেশে তা আরও বেশি জঠিল। কারণ, এখানে শিক্ষিত হওয়ার আগেই অধিকাংশই পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। অনেক লেখকই সাহজ ভাষায় লিখে, আবার অনেকেই কঠিন ভাষায় লিখে। পাঠক যেভাবে গ্রহণ করে। তাই, বলা যায় সাহিত্য পাঠকের ভাষা, সমাজ ও মনমশীলতার সাথে জড়িত। সেই দিক থেকে সাহিত্য সবার জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু তারপরও সীমাবদ্ধতা আছে।

সাহিত্য কি সবার, এই প্রশ্নের জবাবে কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের বলেন, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না সাহিত্য সবার জন্য। মহাকাব্য মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, পৃথিবীতে এর থেকে সর্বাধিক পঠিত বই আর নেই আমার মনে হয়। কিন্তু এই বইটি সবার কাছে পৌঁছেনি। ধর্মীয় গ্রন্থ ব্যতিত। সাহিত্য সবার কাছে পৌঁছবে, এটি লেখকের বাসনা মাত্র। এক এক জন্য সাহিত্যিক এক একটা বিষয় নিয়ে তুলে ধরে। সেখান পাঠক বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দিকে পৌঁছায়। সে অর্থে সাহিত্য অধিকাংশের হয়ে ওঠছে কিন্তু সবার না। তবে সাহিত্য যারই হোক না কেনও সাহিত্য ও জীবন ভিন্ন কিছু নয়।

উল্লেখ্য, ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজিত হচ্ছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহযোগিতায়। এর টাইটেল স্পন্সর ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও অনলাইন নিউজ পেপার বাংলা ট্রিবিউন, প্ল্যাটিনাম স্পন্সর ব্র্যাক। অনুষ্ঠানের সার্বিক আয়োজনে রয়েছে ‘যাত্রিক’। কো-হোস্ট হিসেবে রয়েছে বাংলা একাডেমি। এছাড়াও গোল্ড স্পন্সর হিসেবে রয়েছে, এনার্জিস, পূর্ণভা। গোল্ড পার্টনার হিসেবে থাকছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। সিলভার স্পন্সর হিসেবে রয়েছে, ক্রিস্টোফারসন রব অ্যান্ড কোম্পানি ও ইউল্যাব। এছাড়া আরও পার্টনার হিসেবে রয়েছে বুকওয়ার্ম, সিকিউরেক্স, বেঙ্গল ইন্সটিটিউট আমরা, ইএমকে সেন্টার ইত্যাদি।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon