শিরোনাম

ইয়েটস: জীবন ও কবিতা

রেজওয়ান তানিম  |  ০১:৪৯, জুন ১১, ২০১৯

ইয়েটস: জীবন ও কবিতা
বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যে আধুনিক কাব্যান্দোলনের অন্যতম কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস। দুই মার্কিন (পরবর্তীতে ব্রিটিশ) কবি এজরা পাউন্ড এবং টি এস এলিয়ট এর আগে ইংরেজিতে মর্ডানিজমের প্রারম্ভিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এ কবি। সাহিত্যচর্চার শুরুর দিকে ছিলেন রোম্যান্টিক যুগের প্রতি বিশ্বস্ত, যা এখানে অনূদিত কবিতাতেও দেখা যাবে। যদিও পরবর্তীতে মর্ডানিজমের পথে আগান এবং প্রতীকধর্মী কবিতা লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন, তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন প্রবল রাজনীতি সচেতন এবং আইরিশ হিসেবে নিজের জনপদের ইতিহাস তুলে এনেছেন লেখায়।

তার শিল্পবোধ কখনোই রাজনীতি বিবর্জিত ছিল না, বরং রাজনীতির শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে লেখায়। মার্ক্সবাদের প্রতিও কিছুটা আকৃষ্ট ছিলেন। আধুনিকতার প্রাণ পুরুষ এ কবির কাছে বাংলা সাহিত্যেরও রয়েছে খানিকটা ঋণ। রবীন্দ্রনাথকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, নিজের আগ্রহেই লিখেছেন রবিঠাকুরের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ Songs offerings গ্রন্থের ভূমিকা।

কবিতা অনুবাদের মতো বিড়ম্বনা আর নেই, অনুবাদকের জন্যে, একই সাথে কবির জন্যেও। বিভাষার লাবণ্য, তার ঢং, রূপ রস এক্সপ্রেশন নিজের ভাষায় তুলে আনা হীরার খনি থেকে হীরকখণ্ড তুলে আনার মতোই কঠিন কাজ। আর ইয়েটস এর কবিতার সুর ও ভাষা বাংলায় তুলে ধরা খুবই কঠিন ভাষাগত কারণেই। আর এ কারণেই বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে ইয়েটস এর কবিতা নিয়ে কাজ হয়েছে কম।

কবি সুব্রত গোমেজ এবং জুয়েল মাজহার এ নিয়ে বিশদ কাজ করেছেন। এছাড়া আর কারা করেছেন আমার ঠিক জানা নেই। এদের ছন্দ, ভাষা কিংবা কাব্যবোধ যে পর্যায়ের তা থেকে বহুদূরে আমার অবস্থান, তা সত্ত্বেও কবিতাগুলো তর্জমার চেষ্টা করা। অনূদিত কবিতাগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত।

বহুমাত্রিক এই কবির প্রেম-জীবনেও রয়েছে পাওয়া না পাওয়ার বহুমাত্রিক আখ্যান। কবিজীবনের অতৃপ্ত অধ্যায় সুন্দরী মড গন, যার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল চিরসুন্দরের প্রতি এক মুগ্ধ বালকের আকর্ষণের মতো। এখানে অনূদিত কবি, দয়িতের প্রতি (A Poet to his Beloved ), মৃত্যুস্বপ্ন এক (A Dream of Death) কবিতায় স্পষ্টতই মড গন এর প্রতি কবির অনিঃশেষ ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে, যা মূলগত অর্থে প্লেটোনিক।

মৃত্যুস্বপ্ন এক কবিতায় কবির মানসপ্রেমী হারাবার ভয় থেকে একধরণের শঙ্কার কথা ব্যক্ত হয়েছে। যখন সুন্দরী মড গন নিজের দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে বেড়াতে গিয়েছিলেন এরকম প্রতিকূল পরিবেশে তার মৃত্যু কবি চাননি। কবি, দয়িতের প্রতি কবিতাতে এসেছে শ্বেত রমণীর কথা, যা সেই যুগে শুভ্র ও সুন্দরের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।

জলকুমারী কবিতাটি একজন যুবক ও বৃদ্ধ নামের দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। এই কবিতাটিতে ইশপের গল্পের মতো করে বলা হয়েছে নীতিগল্প। কবিতাটির শেষ চরণ পাঠান্তেই বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের পরে (After Long Silence) কবির কাব্যকীর্তির এক উজ্জ্বল নিদর্শন, যা Words for Music Perhaps (1932) গ্রন্থ থেকে নেয়া। এটি গোটা ইংরেজি সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেমের কবিতা।

অনুবাদকর্মটি উৎসর্গ করতে চাই মেহেরাব ইফতিকে। সম্পর্কগুলো সাময়িক, ভালোবাসা চিরদিনের...

কবি, দয়িতের প্রতি

(A Poet to his Beloved )

এইসব অগুনতি স্বপ্নদিনের গ্রন্থমালা আমার

এনেছি তোমার জন্যে, ভালবাসায় নত হয়ে।

শ্বেতরমণী সে এক, ছুঁয়ে আছে আমায় গভীর প্রণয়াবেগে

ঘুঘুরঙা ধুসর বালু জলেরা যেমন মাখে জোয়ার এলে,

এবং মহাকালের পাণ্ডুর শিখায় কানায় কানায় পূর্ণ

এক শিঙ্গার চেয়েও বৃদ্ধ হৃদয় নিয়ে এসেছি আমি,

সেই যে শ্বেতরমণী, যার ছিল অগণন স্বপ্নদিন

তার জন্য এনেছি গভীরতম কাব্য আমার!

মৃত্যুস্বপ্ন এক

(A Dream of Death)

কেউ একজন মরে পড়ে ছিল এক অচেনা জায়গায়,

স্বপ্নে দেখলাম হঠাৎ!

এবং কাছেপিঠে ছিল না কোন নির্ভরতার হাত,

ওরা পাটাতনে পেরেক ঠুকে দ্যায় সে মুখের ঠিক উপরে।

আর ও দেশের কৃষকেরা

বিস্ময় নিয়ে শুইয়েছিল তাকে শেষতম নৈঃশব্দ্য বাসে।

আর গোরস্তুপের উপর তারা তুলে দিল দুটো কাঠখণ্ডের এক ক্রুশ,

এবং চারদিক ঘিরে দ্যায় সাইপ্রাস গাছে।

এবং রেখে আসে মেয়েটিকে উপরের নির্বিকার তারাদের মাঝে

যতক্ষণ না আমি খোঁদাই করি, এই কথাগুলো-

[প্রথম প্রেমের চেয়েও সে ছিল কিছু বেশি সুন্দর,

কিন্তু এখন চিরঘুমে শুয়েছে সে কফিনের অন্দর ! ]

একজন যুবক ও বৃদ্ধঃ তিন, জলকুমারী

(A Man Young And Old: Iii. The Mermaid)

একদা সাঁতরে বেড়াচ্ছিল বেভুল তরুণ , এমন সময়

এক জলকুমারী, দেখেই তাকে কাছে টেনে নিলো।

শরীরে শরীর ঘষে লিখে গেল প্রেম, মত্ত হলো

কলহাস্যে আর দিল ডুব নিমগ্নতায়!

কিন্তু অসহ্য সুখপ্রাবল্যে ভুলে বসল

এমনকি ভালবাসাও অতলে তলিয়ে যায়।

দীর্ঘ নৈঃশব্দ্যের পরে

(After Long Silence)

দীর্ঘ নীরবতা শেষে আবার আলাপ; সত্যিই তো,

সব প্রিয়জন গিয়েছে হয়ত ছেড়ে নয় মরে,

বিরাগে ছড়ানো শিখা, লুকায় পিদিমের ছায়ায়,

প্রতিকূল রাত ছবি অন্ধ এক চাদরে আবৃত,

উচ্চলয়ে তুলে সুর, বারবার মেতেছি মায়ায়

জেগেছে কথা, শিল্পে ও গীতে মহত্তম কথায়:

জ্ঞান এনেছে জীর্ণতা শরীরের; ছিলাম তরুণ

যখন, বেসেছি ভালো ছিমছাম, আনাড়ি দুজন।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত