রাজনৈতিক শিল্পবোধ ও একটি প্রশ্নশীল চোখ

তাসনিম রিফাত  |  ০১:০৫, জুন ১১, ২০১৯

রাজনৈতিক শিল্পবোধ ও একটি প্রশ্নশীল চোখ
পৃথিবীতে অধিকাংশ সময় সত্য নির্ধারিত হয় আধিপত্যশীল ক্ষমতার দ্বারা। কারণ সবার পক্ষে অনবরত সত্যকে কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। সবাই এমন কাজে আগ্রহীও নয়। রাজনৈতিক শিল্পবোধ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ক্ষমতা আর সত্যের প্রসঙ্গ টানলাম, একটু পর সে ব্যাখ্যা দিলে আশা করি ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার অপরাধ মার্জনা করবেন।

ইউরোপসহ সমগ্র দুনিয়ার যেসব একাডেমিক পরিসরে শিল্পবোধ একটি তত্ত্ব হিসেবে আলোচিত হয়, সেসব পরিসরে রাজনৈতিক শিল্পবোধকে প্রায় কোনঠাসা করে ফেলা হয়েছে। ' শিল্প রাজনীতির থেকে ভিন্ন', 'শিল্প আলাদা সত্য উৎপাদন করে'- এই বক্তব্যগুলো একটু বিশ্লেষণ করলেই আমরা একটা বক্তব্যের কাছে পৌঁছুতে পারব।

আধুনিক জমানায় পুঁজির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক জটিল। কার্ল মার্কসের মতে পুঁজির বিকাশের যুগে কেবল উৎপাদনের ধাপগুলোই বিচ্ছিন্ন হয় না, বিচ্ছিন্ন হয় জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরগুলোও। প্রত্যেকটা জ্ঞানকে আলাদা মূল্য আরোপের মাধ্যমে শতছিন্ন করা হয়। সাহিত্যও এই সমস্যার বাইরে নয়। কিন্তু আমার প্রশ্নটা ওই জায়গায়ই। রাজনীতির বাইরে সাহিত্যের সত্যতা কতটুক? যেহেতু এই ধরণের মতবাদগুলো প্রধাণত ইউরোপে উদ্ভব হয়ে আমাদের দেশে আমদানি হয়, তাই এই লেখায় আমি ইউরোপকে পর্যালোচনার মধ্যে রাখব।

আমাদের একটু ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। মধ্যযুগের পর ইউরোপে রেনেসাঁর সময়কালে পুনর্গঠনের জিকির তোলা শুরু হয়। একটু শক্ত বিচার করলে রেনেসাঁর দার্শনিক চিন্তাকে খুব বড় ভাবা যায় না, বরং সেসময় ইউরোপে গ্রেকো-রোমান চিন্তার পুনর্গঠন আকার পেতে শুরু করে। রেনেসাঁর এই পুনর্গঠনের শক্তি অনেকটাই বিকশিত হয়েছিল শিল্পের দ্বারা। শিল্পের সাহায্যে চার্চের কতৃত্ববাদী ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, আঘাত করা আর নতুন মানবিকতার বিকাশ; একে কি আমরা রাজনৈতিক বলব না?

এরপর ১৬০০ সালের আশপাশে ইউরোপ যে আলোকময়তার যুগে প্রবেশ করল তাতেও শিল্পের প্রভাবটা দেখুন। কান্ট কথিত মানুষের নিজেকে আলোকিত করা আর সাবালক হওয়ার এই আন্দোলনে শিল্প-সাহিত্য সবসময়ই প্রথম অবস্থানে ছিল। এইখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশের প্রশ্নও জড়িত।

মানুষের চাওয়া-পাওয়ার নানা ধরণ থাকে। মানুষ রাষ্ট্র গঠন করে তার ইহজাগতিক চাওয়া-পাওয়াকে একটা আকার দেবার জন্যে। তাছাড়া মানুষের আরো এমনকিছু কার্যক্রম আছে, যা প্রচলিত প্রতিষ্ঠান দিয়ে ধরা যায় না, যা কাজ করে যায় মানুষের একদম ভেতরে; সেসব অভিব্যাক্তি কেবলমাত্র শিল্পের মাধ্যমেই প্রকাশ সম্ভব।

ইউরোপে বড় একটা সময় রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সরাসরি যোগটা ছিল এবং সেটা স্বীকারও করা হতো। কিন্তু আলোকময়তার দার্শনিক বিভ্রান্তি আর ক্ষমতালাভের লোভের কারণে ইউরোপে সেই আলো পরিণত হলো অন্ধকারে। যে দর্শন মানুষের স্বাধীণতার কথা বলল, সে দর্শন দিয়েও বাঁচানো গেল না বিপ্লবের হিংস্রতা আর যুদ্ধের ভয়াবহতা। আলোকময়তার সেসব আশাবাদী মানুষেরা পরিণতিতে ডুবে গেল নিরাশায়। ইউরোপিয়ান সাহিত্যতত্ত্বে সাহিত্যকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার চেষ্টাটা খুব পুরনো নয়; বলা যায় বিশ্বযুদ্ধগুলোর পরেই।

এখন আমাদের বিবেচনা করতে হবে তত্ত্বের স্থানিকতা নিয়ে। যেকোনো তত্ত্বই সে স্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে। ইউরোপে যেসব তত্ত্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দানা বেঁধেছে তা ইউরোপের বাইরে কতটুক প্রাসঙ্গিক? ইউরোপে জ্ঞানতত্ত্বের যে প্রক্রিয়াগুলো ঘটেছে তার সাথে অন্যান্য অঞ্চলের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলোর ভিন্নতা কম নয়। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে বসে শিল্পচর্চা আর শিল্পবিচারের ঝামেলা হলো, এখানে ইউরোপীয় স্ট্যাডার্ডগুলোই প্রায় পূজনীয়ভাবে মান্য করা হয়। যে কারণে যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া বাংলাদেশে সৃষ্টিই হয়নি, সেই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত একটা তত্ত্ব দিয়ে এদেশের শিল্পবিচার বিভ্রান্তিকরই বটে।

রাজনৈতিক শিল্পবিচারের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা তৈরি হয়। এজন্যই ফরাসি শিল্পতত্ত্ব দিয়ে আমাদের ষাট আর সত্তরের দশকের কবিতা বিচার করাটা বোকামি, তেমনি বায়রনের সাথে মধুসূদনের তুলনা দেওয়া হলেও এদের সাহিত্যের স্থান, কাল আর প্রেক্ষাপট অনেকটাই আলাদা। আমার ধারণা, পাবলো নেরুদা ফ্রান্সে থাকলে আর বোদলেয়ার চিলিতে থাকলে দুইজনের কবিতায়ই ভিন্ন হতো। হয়তো বোদলেয়ার নেরুদার মতো লেখা শুরু করতেন।

আবার তত্ত্ব নিজেও শিল্প সমালোচনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা নিয়ে হাজির হয়। শিল্প একটি স্বপ্রাণ বস্তু। মানুষের চলতি সময় আর জনজীবন থেকেই শিল্প উঠে আসে। অন্যদিকে তত্ত্ব হচ্ছে বিমূর্ত এক মাধ্যম; যার প্রাণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একাডেমিক পরিসরে জন্ম নেয়া জনবিচ্ছিন্ন তত্ত্বগুলো দিয়ে স্বপ্রাণ শিল্পের বিচার করা কঠিন। রাজনৈতিক দাবি নিয়ে উঠে আসা শিল্পগুলোর ব্যাপারে আরো সমস্যা সৃষ্টি হয়। কারণ যেকোনো শিল্প মাধ্যমে রাজনীতি স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়ার চেয়েও গতিশীল।

আমাদের এই পৃথিবীতে যেখানে একটা ভুল খবর ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ মারার পক্ষে সম্মতি অর্জন করা যায়, সেখানে শিল্প-সাহিত্য রাজনীতির বাইরে এই কথা বলাটা বেওকুফি ছাড়া আর কিছু না। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা আর নিষ্ক্রিয়তাও রাজনীতিরই অংশ।

শিল্পতত্ত্বে আসলে আলাদাভাবে রাজনীতি ঢোকানোর কিছু নেই। বরং শিল্পতত্ত্বের সাথে রাজনীতির যোগ সবসময় ছিল, এখনো আছে। হয়তো আমরা তা স্বীকার করতে চাচ্ছি না। এই অস্বীকারে লাভটা কার সেটাও ভাবা দরকার।

এসএস