শিরোনাম

কাশফুল, প্রিন্সেস এবং মারিয়াপিতা

মোক্তার হোসেন  |  ১৫:৪১, জুন ০২, ২০১৯

কাশফুল, প্রিন্সেস এবং মারিয়াপিতা
নিঃসঙ্গ কাশফুলগুলো যেন বড় অভিমানী। ফুরফুরে বাতাসে মনযোগ নেই, কিন্তু অবচেনত মনে কিঞ্চিত দোল খেয়ে নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকে শেকড় গেঁথে রাখা মাটির দিকে, ভাবনায় তখনও তার জমাট বাঁধা শরতের মেঘ। এমনি নিঃসঙ্গ একদল কাশফুলের সাথে সখ্যতা গড়ে মেঘের কাছাকাছি চলে গেছে কতগুলো পাহাড়, যার পাশ দিয়ে কিছুটা সমতল কিংবা উঁচু নিচু আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে পিচঢালা পথেরা চলে গেছে শহরের কোলাহলে। এই শহরের কোলাহলের নাম গাঙচিল।

ল্যাম্পপোস্টের উপরে বসে যারা দেখে যায় নাগরিক সভ্যতা। উঁচু উঁচু দালানের বয়সের সাথে সহস্র বছরের সমুদ্রের গর্জন আর হিমশীতল বাতাসে মিশে থাকে কতো প্রেম কিংবা দ্রোহ। মেঘের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা স্বাধীন ভাবনাগুলো আটলান্টিকের পাড়ে এসে যখন জমাট বাঁধে, তখন তার নাম অষ্টাদশী চাঁদ। কিশোরীর লাজুক যৌবনে একটু ঘোমটা টেনে সবটুকু মেলে ধরে আর সাগরের ঢেউগুলো তার প্রেমে তীরে আছড়ে পড়ে মুহুর্মুহু।

মারিয়াপিতা সড়ক থেকে কিছুটা ডানে কিংবা বামে, যেদিকেই আনমনে হেঁটে যায় না কেন পথিক, সমুদ্রকন্যা তাকে আপন করে নেয় মুহুর্তেই। সন্ধ্যা ঘনাতেই সড়কের পাশে বসে যায় প্রতিদিনের মেলা। ঠাণ্ডা বাতাসের বিপরীতে রাউন্ড নেক টিশার্ট পরা কোন এক অপরিচিত শিল্পী স্প্যানিশ গিটারের মূর্ছনায় এসপানিওল ভাষায় দরাজ গলায় যখনই সুর তোলে ‘ও প্রিন্সেস’ ছোট ছোট কুকুরের ফিতা হাতে নিয়ে ধবধবে বালিকার নিরব হেঁটে চলার ছলেও ছেলে বন্ধুটির সাথে কোরস পেছন ফেরে একপলক দেখে আর থমকে দাঁড়ায়। যেন মহারাণীকে পাওয়ার জন্য যত সুর ঢেলে দেয় পথের ধারে, আর অনাদরে পড়ে থাকা ভালোবাসাগুলো ভিখারীর মতো প্রিন্সেসের কাছে আকুতি জানিয়ে কাছে টেনে নিতে মিনতি করে। ততক্ষণে ছেলে বন্ধুটির কাঁধে আছড়ে পড়ে মেয়েটি আর আটলান্টিকের তীরে আছড়ে পড়ে সহস্র ঢেউ।

পথের ধারে এমন সুর আর কাশফুলের সাথে ল্যাম্পপোস্টের উপর বসে থাকা গাঙচিলেরা কেন জানি চেনা চেনা সর্বত্র। মারিয়াপিতার পাশে গান গেয়ে কিছু পয়সা উপার্জন আর ‘শোনো মামিন মোসলমানো, করি আমি নিবেদনো’ এর সাথে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আটলান্টকের ঢেউগুলোর পাড়ে নীল শাড়ি পরে আনমনে যেন একই সুরে কেউ গেয়ে যায় ‘সাগরের তীর থেকে, মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে’।

অথবা শহর থেকে একটু দূরে পাহাড়ের ঢালে নিঃসঙ্গ কাশফুলগুলো নিয়েই হয়তো কবি বলেছেন, ‌‌‌‘একমুঠো অভিশাপ যেন এই কাশফুল, এই শরতের মেঘ’। এমন বিচ্ছিন্ন ভাবনাগুলোর কোন মানচিত্রের সীমারেখা নেই। তাদের প্রয়োজন হয় না কোন পাসপোর্ট কিংবা সেনজের ভিজার। ইমিগ্রেশন অফিসার কখনও জিজ্ঞেস করেনি, ভাবনাগুলোর ভিসা নিয়েছো? অথবা, তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দাও।

দলবেঁধে স্কেটিং আর কুকুরের সাথে রাত্রিকালীন হাঁটা আর প্রচণ্ড শীতে ঠাণ্ড আইসক্রিম, এসব যেনো চিরচেনা। জাহাজের মাস্তুল অথবা লাইটহাউজ থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে সমুদ্রের কাছে যে ওয়াকওয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ও সমুদ্র, তোমার বয়স কতো?’, সেই ওয়াকওয়ের পাশে হয়তো কোনো ইরানি বালিকা হিজাব পরে বসে থাকে আর শর্ট স্কার্ট পরে পাশ দিয়ে অবলীলায় হেঁটে যাওয়া যেন মিলে মিশে একাকার।

দুপুরের রোদেরা যখন একটু সরব হয়, তখনই বিকিনি পরা নারীদের তীরে রেখে সার্ফিং আর প্রাচ্যের কোনো আগন্তুকের অপলক চেয়ে থাকাটা যেন এক আশ্চর্যের নাম। এখানেও ছায়ারা সাথে সাথে হাঁটে, এখানেও রোদেরা উত্তাপ ছড়ায়, এখানে হিমশীতলতায় উষ্ণতার আলিঙ্গন খুঁজে ফেরে দেহঘর। সেখানেও স্মৃতিতে ভেসে আসে কলাপাতায় ঘেরা স্নানঘরে উঁকি দিয়ে দেখা রতনপুরের হিন্দুপাড়ার মেয়েদের শরীরের ভাঁজ।

তাজমহলের পাশ দিয়ে হেঁটে সম্রাট শাহজাহান মমতাজের স্মৃতিকাতর হয়েছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু হৃদয়ের তাজমহলে প্রেমকাতরতায় কোনো প্রেমিক কখনও তাজমহল হোটেল থেকে কতটা প্রেম অনুভব করেছে তা সহজেই অনুমেয় আটলান্টিকের পাড়ের তাজমহল রেস্তরাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে।

একই নাম, কিন্তু পুরোটাই আলাদা, একই পথ তাই কোনো কোনো সময় নিয়ে যায় ভিন্ন গন্তব্যে। আর ভিন্ন গন্তব্যের পথিক আবার দিকভ্রান্ত হয়ে মিলিত হয় অভিন্ন গন্তব্যে। তেমনই এক গন্তব্যের নাম আকাশ, তেমনই এক গন্তব্যের নাম মেঘ, তেমনই এক গন্তব্যের নাম বৃষ্টি, তেমনই এক উপাখ্যানের নাম লা-করুনিয়া।

‘বিয়ার ইজ ফর ম্যান, কোক ইজ ফর ওম্যান’— রেস্তরাঁর ওয়োটারের সাথে একটু রসিকতা করতে করতে এখানকার কেউ যখন বলে ‘বিয়ার ইজ ফর ম্যান, কোক ইজ ফর সুপারম্যান’ তখন আশপাশে টেবিলের সবাই এক পলক কান খাড়া করে শোনে— ‘এস্ট্রেলা গালাসিয়া’য় চুমুক দিয়ে বলে চিয়ার্স!

দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিনারের টেবিলের সী-ফুড চেখে দেখা। এক বা দুই ইউরো টিপস ওয়েটারের কোমর বন্ধনীর সাথে রাখা ব্যাগে পুরে কিছুক্ষণ পূর্বে রসিকতার গেস্টটাকে ‘গ্রাসিয়াস’ বলা, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেখানকার কিংবা এখানকার ওয়েটার, উভয়ের মধ্যেই মিল টিপসে, ব্যবধান রসিকতায়।

রাস্তার পাশে শারিরিক কসরত, নানা অঙ্গভঙ্গি কিংবা নৈপূণ্য প্রদর্শন করে যাওয়া এই শহরের যুবকটি যেন কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশেরই কোনো এক অবহেলিত প্রতিভা। বোতলের ভেতর দাহ্য, হাতে আগুন আর কিছুক্ষণ পর পর জ্বলে ওঠা শিখা আর চারদিক ছোট ছোট হাততালি। একজনের হ্যাটে ইউরোপীয় মুদ্রা আরেকজনের থালায় দুই টাকার নোট কিংবা পাঁচ টাকার কয়েন। একজনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর অন্যজনের প্রতি কিছুটা তাচ্ছিল্য।

এখানে পুরোটাই মিল তবে অবহেলায় যত ব্যবধান। মানুষগুলোর আকৃতি এক প্রকৃতি আলাদা। সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব আছে সেখানে কিন্তু কতোটুকু ভাবাবেগে তাড়িত তারা তা অনুমেয় নয়। তবে বাদামী কিংবা ধূসর চামড়ার নিচের আবেগের কাছে তারা নিশ্চিত পরাজিত। কিন্তু সমুদ্র সৈকত ছেড়ে সভ্যতা দেখতে আসা সহসা উড়ে যাওয়া গাঙচিলদের কোথাও কোনো পার্থক্য নেই।

সেখানে কোলের শিশুটিকে ট্রলি নামের ঠেলাগাড়িতে নিয়ে হাঁটছেন মা, এখানে মায়েরা বুকের সাথে আঁটসাট করে জড়িয়ে রাখে। সেখানে মায়েদের আঁচল নেই, এখানকার কথা ভিন্ন; কিন্তু স্তনের ঘ্রাণ সব শিশুদের কাছেই অভিন্ন। স্নেহের আলোর বিচ্ছুরণে সব শিশুদেরই চোখে বিচ্ছুরিত স্বর্গের আলো। যেখানে বড়দের ধর্মদেবতা আলাদা কিন্তু শিশুদের দেবতাটির নাম ঘাসফুল।

প্রতিটি মানুষ যেন উর্ধ্বমুখে ছুটছে কোন অজানার সন্ধানে, এইতো বুঝি ধরে ফেলবে। আহা, এক মুহুর্ত ব্যবধানে যেন ফাঁকি দিয়ে গেছে তাকে। ঠিক যেন ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পরে দৌড়ে না গিয়ে দ্রুত হেঁটে ধরতে না পারার বেদনা। এমন বেদনাগুলো ঘুরপাক খায় ঘূর্ণিঝড়ের হৃদপিণ্ডে, ছুটে চলে এক মহাসমুদ্র থেকে অন্য মহাসমুদ্রে। ঘণীভূত হয়, নিম্নচাপের ঘোমটা পরে কখনো আরব সাগর পার হয়ে আছড়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যে।

লণ্ডভণ্ড করে ইরাক, সিরিয়া কিংবা লিবিয়া আর শিশুদের আত্মচিৎকারে প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাস আটলান্টিকের কানে কানে যখন সেই কথাগুলো বলে দেয়, তখন লা-করুনিয়া কিংবা মাদ্রিদ অথবা বার্সেলোনার শিশুরাও কোরাস আর্তনাদে রক্তাক্ত হয়।

সন্ধ্যা প্রদীপের রঙ সেখানে হলুদ কিংবা নিয়ন, যেখানে হয়ত সহস্র বছর আগে কেরোসিনের কুপি জ্বলত। হয়ত তখনও এখানেও কোনো বাউল লালনের মতো সুর তুলত নিজস্ব ঢঙে আর শুধু ভাষার ব্যবধানে ভিন্ন কোনো ঢঙের একতারার সুরে গাইত ‘হব বলে চরনদাসী... আমার মনের মানুষেরই সনে’।

অথবা এমন ভাবনা কেবলই নিছক, কিন্তু যে চমৎকার সুরের গানটি মধ্যবয়সী ওই নারী কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে গাইতে গাইতে সামনে রাখা স্কার্ফটিতে পড়ে থাকা ইউরোর হিসাব কষে, তার সাথে লালনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ‘আমার আল্লা-নবীজীর নাম’ গাওয়া গানের দলের ব্যাপক মিল রয়েছে।

শুক্রবারের রাত সেখানে সজাগ, এখানে ঘুমায়। অসংখ্য চুমুর শব্দে অবলীলায় বিনিময় হয় সপ্তাহজুড়ে জমাটবাঁধা অনুভূতিগুলো। মৃদু আলোছায়ায় উন্মাদনায় জেগে থাকে আদিমতা। কবিতার মতো ধুম্রজালের জলে ডুবে যায় আটলান্টিক, উছলে পড়ে কামনার জল।

উরুসন্ধির সমুদ্রপাড়ে কামাতুর যুবকের সার্ফিং চলে ভোর অব্দি। আর এখানে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে যখন ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওয়ম’, তখন স্নান শেষে ফজরের ওয়াক্তে মুসুল্লির অপূর্ণ কাতারে ‘ইক্তাদাইতুল বিহাযাল ইমাম’ বলে সামান্য কয়জন দণ্ডায়মান, বাকীরা মরণঘুমে।

সময়ের ব্যবধানে পূর্বদিগন্ত অগ্রজ আর সূর্যের পক্ষপাতে পশ্চিম বিলম্বে আলোকিত। কিন্তু সূর্যকিরণে আলোর গতিবেগ সমান। একই আলোকবর্ষ দূরে পৃথিবীর এক পৃষ্ঠে যখন চলে ‘দেসপাসিতো’, অন্যপৃষ্ঠে তখান সোমালিয়ার হাড্ডিসার শিশু।

একপাশে যখন ‘গান্স এন্ড রোজ’ কনসার্টে ছুটছে উন্মাদ তারুণ্য, অন্যপাশে তখন বোমার আঘাতে আহত শিশু কোলে নিয়ে পিতা ছুটছেন হাসপাতালে। অভিন্ন আকাশ, অভিন্ন সূর্য, অভিন্ন পৃথিবী, অভিন্ন কাশফুল, অভিন্ন গাঙচিল, অভিন্ন অষ্টাদশী চাঁদ কিন্তু ভিন্ন জীবন।

পাহাড়, সমুদ্র, পিচঢালা পথের ধারে পাঁচতারকা হোটেলের সামনে রঙধনু কনসার্টে যখন লেসবিয়ান দুটি মেয়ে অচেনা ভাষায় গান গেয়ে যায়, শাহজালাল ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা যাত্রায় পাশের সিটে দুই বন্ধুর পরম আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে সমস্ত রাস্তা চুমু খাওয়ার রহস্য তখন পরিস্কার হতে থাকে। উভয়ের সন্ধির নাম রঙধনু, বিচ্ছেদের দূরুত্ব প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের সমান।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত