শিরোনাম

আরশজানের বায়োস্কোপ

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী  |  ২০:৫১, মে ২২, ২০১৯

আরশজানের বায়োস্কোপ
কবুতরের বাকশোর মতো খোপ করা একটা বাকশো। পঁচাত্তর বয়সের মোতালেব এই বাকশোর সঙ্গে নাতনী আরশজানের নাম জুড়িয়ে বাকশোর নামকরণ করেন 'আরশজানের বায়োস্কোপ'। প্রত্যেক রোববার আরশজানের বায়স্কোপ গোপালপুরের সাপ্তাহিক হাটে আসে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে হাটের ভীড়। বাড়তে থাকে আরশজানের বায়োস্কোপের দর্শকও।

অবশ্য সবাই যে বায়স্কোপের টানে আসে তা কিন্তু নয়। কিছু কাপুরুষ আছে, যারা চোখ দিয়ে গিলে খেতে আসে আরশজানের দেহবল্লড়ি। হলুদ বাটা গায়ের রঙ, মেঘকালো চুল, মাঙ্গলিক কপাল, টোল পড়া গাল, ঈদের চাঁদের মতো এক জোড়া ঠোঁট আর মসজিদের গম্বুজের মতো মানানসই দুই স্তন যেন উপাদান হয়ে ওঠে ওদের বেফাঁস আলোচনায়। অবশ্য সেদিকে কান নেই কিশোরী আরশজানের। সে পূর্ণ মনোযোগে আওড়িয়ে যায়,

কি চমৎকার দেখা গেল/ঢাকা শহর আইসা গেল...

ওই বন্ধ কর এইসব!

রুস্তম লাঠিয়ালের এমন বজ্রধ্বনিতে থেমে যায় আরশজানের বায়স্কোপ। উৎসুক দর্শকরাও সরে যায় মুহূর্তেই। আরশজান রুস্তমকে জিজ্ঞেস করে,

ক্যান? কী অইসে?

কি অইসে মানে? জোয়ান মাইয়া মানুষ অয়া বেডা মাইনসের সামনে খাঁড়াইতে লজ্জা লাগে না?

মাইয়া হয়া জন্মানোডা কি দোষের?

দোষগুণ বুঝি না। চেয়ারম্যান সাবের হুকুম। বায়স্কোপ দেহান যাইব না। এইডা দেখলে মানুষ দোযখী হয়া যাইব। হেল্লাইগা এই শইতানের বাকশো জ্বালাই দেওয়া অইব।

রুস্তম আর আরশজানের কথা কাটাকাটির ভেতর আচমকা এক বৃদ্ধ এসে রুস্তমের পা জড়িয়ে ধরেন,

মাফ কইরা দেন হুজুর। আরশজান আমার নাতিন। ও ছোড মানুষ। বুঝবার পারে নাই। বায়স্কোপ আসলে আমিই দেহাই। আল্লাহর দোহায় লাগে গরীবের পেটে লাত্থি দিয়েন না হুজুর।

কি কইল্যা? আমি তোমার পেটে লাত্থি দিছি। ঠিকাছে চেয়ারম্যান সাবের কাছেই চলো তাইলে।

এই বলে রুস্তম তার সাথের চেলাচামুণ্ডাদের হুকুম করে,

ওই, বায়স্কোপ লয়া চেয়ারম্যান সাবের বাড়ি চল।

রুস্তমের কথামতো ওরা বায়স্কোপ নিয়ে হাঁটা ধরে। তাদের পেছন পেছন হাঁটা ধরে আরশজান আর বৃদ্ধ।

দুই. হারামজাদারা! একটাও কামের না। হেই কহন পাডাইছি, অহনও আওনের নাম নাই। আইয়োক আইজ।

কাছারি ঘরের বারান্দায় পায়চারি করছেন আর বিরবির করে বকছেন মাঝবয়সী চশমা চেয়ারম্যান। চশমা চেয়ারম্যানের আসল নাম সিকান্দার। তিন তিনবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান সিকান্দারের প্রত্যেকবারই চশমা প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন। সে জন্যেই জনতা তাকে চশমা চেয়ারম্যান বলে ডাকে। চশমা চেয়ারম্যান হাটের দিকে যাওয়া সাপের মতো পথের দিকে কিছুক্ষণ পর পর তাকাচ্ছেন আর বিরবির করে বলছেন, আইয়োক আইজ হারামজাদারা।

বায়স্কোপ নিয়ে রুস্তমদের পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়ায়। চেয়ারম্যানের চেহারার দিকে তাকিয়েই রুস্তম বুঝতে পারে মেজাজ কি পরিমাণ হট। তাই মাথা নিচু করে চুপ হয়ে থাকে। কিন্তু চুপ থাকে না আরশজানের নানা মোতালেব। কালবিলম্ব না করে চেয়ারম্যানের পা জড়িয়ে ধরেন,

ভুল হয়া গেছে হুজুর। মাফ কইরা দেন। আল্লাহর দোহায় লাগে, আমার বায়স্কোপ জ্বালাইয়েন না। এইডা দিয়াই পেটের ভাত যোগাই। এইডা জ্বালায়া দিলে না খায়া মরন লাগব। নিজের কতা না বাদই দিলাম, এতিম নাতনিডার কী অয়ব?

বৃদ্ধের অনুনয়ে মন গলে না চেয়ারম্যানের। আসলে বৃদ্ধের কথা তার কানেই পৌঁছেনি। পৌঁছবেই বা কী করে? চেয়ারম্যান কি আর হুঁশে আছেন? উনি তো মজে আছেন সোনালি ফুলের মতো কিশোরী আরশজানের জোসে। আরশজানকে দেখামাত্রই তার দুই চোখ ফাগুনের আগুনে অঙ্গার। চশমা চেয়ারম্যানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, এইডা তো মাইয়া না রে, সাক্ষাত অপ্সরী!

চেয়ারম্যানের কাছারিঘর যেন ইন্দ্র দেবের দেবালয়ে রুপান্তরিত হয়েছে। ইন্দ্র দেবের মতো চশমা চেয়ারম্যানও কামনার সহস্র চোখে চুষে নেয় আরশজানের কাঁচা শরীর। অকস্মাত তার তন্ময়তায় জল ঢেলে দেন বৃদ্ধ মোতালেব। চেয়ারম্যানের পায়ে ঝাঁকি দিয়ে বলেন,

হুজুর! এতিম নাতনিডা নিয়া না খায়া মরতে অইব।

চশমা চেয়ারম্যান ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, এতিম! এইডা কয়াই তো দুর্বল কইরা দিলি রে।

দয়া করেন হুজুর।

যা, আইজ থেইক্কা তোরার আর বায়স্কোপ দেহায়া ভাত যোগান লাগব না। তোরার খাওন-দাওনের সব দায়িত্ব আইজ থেইক্কা আমার।

কি কন হুজুর!

হুম। তয় একটে কথা!

কী কথা হুজুর?

আরশজান রে আমার খুব পছন্দ অইছে। ওরে আমায় দিয়া দে। কোনো অযত্ন অইব না কথা দিলাম। ওরে আমার তিন নাম্বার বিবি বানায়াম। তোরেও চার বিঘা ধানি জমি দিয়াম। ভাতের অভাব আর থাকব না তোর।

লাগত না আমার ধানি জমি। রিজিকের মালিক আল্লাহ।

এই বলে বৃদ্ধ আরশজানের হাত ধরে চলে আসতে চাইলে আরশজান পায়ের খুঁটি ধরে বলে, আমি চেয়ারম্যান সাবের প্রস্তাবে রাজি।

ওরে বুবু, তুই বুঝবার পারতাছত না এই শয়তান বেডা তোরে...

আমি ভালা কইরাই বুঝবার পারছি নানা। পুরুষ মাইনসের চোখ পইড়া বুঝার মতো বয়স অইছে আমার। তোমারে একটা কথা কই নানা। মন দিয়া হুনো। ভিক্ষুকের লাহান গেরামে-গেরামে, হাটে-মাঠে না ঘুইরা ওনার কথায় রাজি হওন ঢের ভালা।

এ কথা শুনার পর মোতালেব আর এক মুহূর্তও দেরি করেননি। তার চলে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান রুস্তমদেরও চলে যেতে ইশারা করে। তার পর আরশজানকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। ভেতর থেকে খিড়কী লাগানোর শব্দটা দূর থেকেও পৈশাচিক আনন্দ দেয় রুস্তমদের।

তিন. সত্য কইরা একটা কথা কইবেন?

আরশজানের জিজ্ঞাসায় চেয়ারম্যান সহাস্যে বলেন, কী কথা?

আপন্যার মাইয়া নাছিমার বয়স কত?

চৌদ্দ।

আমার সতের।

হেল্লাইগা কি অইছে?

নিজের মাইয়ার বয়সী আরেকটা মাইয়ার গতরে হাত দিতে পারবেন? মাইয়ার চেহারা ভাইসা ওঠব না?

আরশজানের এবারের কথাটা যেন চটাস করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয় লম্পট চেয়ারম্যানের গালে। নির্লজ্জেরও যে লজ্জা থাকে, তা বোঝা গেল হাওয়া ছাড়া বেলুনের মতো চুপসে যাওয়া সিকান্দার চেয়ারম্যানের চেহারা দেখে।

আরশজান চেয়ারম্যানের আপাদমস্তক এক নজর দেখে একটা বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলে, কষ্ট পাইছেন?

না।

আমার একটা শর্ত আছে।

আরশজানের মুখে শর্তের কথা শুনে সিকান্দার চেয়ারম্যানের ধড়ে যেন প্রাণ আসে। চেয়ারম্যান বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী শর্ত?

আমারে ছোঁয়ার আগে আমার বায়স্কোপ দেহা লাগব।

হা হা হা। এইডা আর এমন কি শর্ত?

ক্যান, বায়স্কোপ দেখলে পাপ অয়ব না?

ওরে পাগলী, এরচেয়ে বড় বড় পাপ কইরাই তো বইসা আছি।

বারান্দা থেইকা আমার বায়স্কোপ নিয়া আসেন।

চেয়ারম্যান আরশজানের কথা মতো বারান্দা থেকে বায়স্কোপ নিয়ে আসে।

দরজা লাগাইবেন না?

লাগাইতাছি।

দরজা লাগিয়ে চেয়ারম্যান আরশজানের কাছে এলে আরশজান বায়স্কোপের একটা খোঁপ খুলে বলে, এইহানে চোখ রাহেন।

সিকান্দার আরশজানের আদেশ তামিল করে। আরশজান বায়স্কোপের কাঠি নাড়াতে শুরু করে, সেই সাথে বায়স্কোপের ফটোরও বর্ণানা দিতে থাকে, বাকশোর খোঁপে চক্ষু রাইখ্যা/ দেখেন আপন নয়ন ম্যাইলা/ আমলনামার হিসেব দেখা যায়...

কুড়ি বছর আগে ছিল মেম্বার মানিক চাঁন/ তার ঘরে কাজের মাইয়া ছিল গোলাপজান...

আরশজানের মুখে 'গোলাপজান' উচ্চারণ হওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে বায়স্কোপে একটা ছবি ভেসে উঠে। ছবিটা দেখেই সিকান্দার চেয়ারম্যান লাফিয়ে ওঠে। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে গোলাপজান...

চার. সিকান্দার চেয়ারম্যানের বাবা মানিক চান সে বছর তৃতীয়বারের মতো ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু নির্বাচিত হয়েও তার মুখে বিজয়ের হাসি নেই। তার একমাত্র কারণ মোসলেম লাঠিয়ালের মৃত্যু। নির্বাচনের আগের দিন বিপক্ষের লোকদের সাথে লড়াই বাধে মানিক চানের লোকদের। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে বিপক্ষ থেকে একটা বল্লম ছুঁড়ে মারা হয় মানিক চানকে লক্ষ্য করে। সেই বল্লম প্রতিহত করতে মোসলেম তার বুক পেতে দেয়।

নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে মানিক চানের জীবন। মোসলেম লাঠিয়ালের ছিল ১৭ বছরের এক মেয়ে। নাম গোলাপজান। জন্মের দুই বছর পর গোলাপজান তার মাকে হারায়। আর আজ হারাল বাবাকে। প্রতিবেশীরা গোলাপজানকে সান্ত্বনা দিতে এসে বলেন, আহা রে! বেচারির মাথার উপর আর কোনো ছায়া রইল না।

প্রতিবেশীদের মুখে ছাই ছিটিয়ে মানিক চান গোলাপজানকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। মাস কয়েক যেতেই মানিক চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সিকান্দারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে গোলাপজান। ঠিক সম্পর্ক নয়। বলা যায় সিকান্দারের পাতানো ফাঁদ। এই সম্পর্কের কথা চেয়ারম্যানের কাছে যখন পৌঁছে তখন গোলাপজান চার মাসের অন্তঃস্বত্বা। শালিসে সিকান্দার নির্দোষ প্রমাণিত হলে সিদ্ধান্ত হয় গোলাপজানকে পাথর মেরে হত্যা করার। আগামী শুক্রবারে কার্যকর করা হবে এই রায়। শালিসে যে গোলাপজানের পক্ষের কেউ ছিল না তা নয়। কিন্তু চেয়ারম্যানের ছেলের বিরুদ্ধে আঙুল তোলার সাহস কই তাদের?

মানিক চান সিকান্দারকে বাগেরহাট পাঠান পাগলা বাবাকে নিয়ে আসতে। পাগলা বাবাই প্রথম পাথরটি ছুড়ে মারবেন। কিন্তু পাগলা বাবাকে নিয়ে এসে সিকান্দার দেখে গোলাপজান আর নেই। গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করেছে। আগুনে পোড়া ঘরটির দিকে তাকিয়ে সেদিন সিকান্দারও একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল।

আশ্চর্যের বিষয়! আরশজান এসব জানল কী করে? সিকান্দার চেয়ারম্যান ভাবে, তবে কি আরশজান গোলাপজানের প্রেতাত্মা!

সিকান্দার আয়াতুল কুরসী পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে আরশজানকে জিজ্ঞেস করে কেডা তুই?

আমারে অহনো চিনবার পারো নাই?

না। কেডা তুই?

আমিই সেই গোলাপজানের গর্ভের সন্তান।

কী!

হুম। তোমার ঔরশজজাত সন্তান।

আমি বিশ্বাস করি না। গোলাপজান ওই দিনই...

না। গোলাপজান ওইদিন আত্মহত্যা করে নাই। আত্মহত্যার নাটক সাজায়া মানিক চান তারে পলাইতে সাহায্য করছিল। মানিক চান তোমারে বাগেরহাট পাঠাইছিল এল্লাইগাই। হেই রাইতে মানিক চান গোলাপজানরে কইছিল, মা রে, আমি জানি সিকান্দারই প্রকৃত দোষী। কিন্তু আমি নিরুপায়। চেয়ারম্যানের পোলা এই কাম করছে জানলে লোকজন আমারে থুথু দিব। তুই মা আইজ রাইতেই পলাইয়া যা।

‘গোলাপজান মানিক চাঁনের কথামতো ওই রাতে পলাইছিল। আর মানিক চান খালি ঘরে আগুন লাগাইছিল, যাতে তোমার মনে কোনো সন্দেহ না থাহে’

আমারে তুই মাফ কইরা দে মা!

থু! তোমার এই নাপাক মুখে মা ডাক মানায় না। তোমার সামনে অহন দুইডা পথই খোলা আছে। হয় নিজে মরো, নয় আমারে মারো।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত