শিরোনাম

ছোটগল্প: নির্জন মাঠে ডাকে অনন্ত আড়াল

কাউসার মাহমুদ  |  ২০:৫২, মে ১৭, ২০১৯

নির্জন মাঠে ডাকে অনন্ত আড়াল
একদিন একটি প্রশান্ত নির্মল সকালে রওয়ানা হন আবু ওয়ালেদ। শান্ত নিবিড় প্রার্থনা ঘরটি ছেড়ে তিনি যাচ্ছেন বহুদূর তার পূর্বপুরুষের গ্রামে। যেখানে তিনি জন্মেছিলেন। যে মাটিতে তার নাড়ি পোঁতা।

সেখানে তাদের ভিটেমাটি ও জমির খেতগুলো ছিলো উর্বর, দুগ্ধবতী উট আর বকরীর পালে ভরা ছিলো পরিচ্ছন্ন গোয়াল। সকালে প্রার্থনার পর পারিবারিকভাবেই খাওয়া হতো গাওয়া। মেয়েরা ঘরের কাজে লেগে গেলে আবু ওয়ালেদ তার ছোট্ট বোন রাফেয়াকে নিয়ে বেরিয়ে যেত খেজুর বাগানে। তার পাশেই হারজা গ্রামের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় জাবালু রাআদ।

রাফেআ বাগানে বসে বসে বকরীর পাল পাহারা দিত। তার ছোট্ট নীল বেণী দুটো ঝুলে থাকত দু'কাঁধে। হাঁটলে মরুবাতাসে সবুজ পাতার সাথে উড়ত তার চুল এবং চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত নুপুরের ঝুমঝুম শব্দ। আবু ওয়ালেদ মন ভরে দেখত দেবীর মতো নির্মল বোনের সে মুখ। কিভাবে হাঁটছে ও। আর বাতাস কি করে খেলছে তার চুল নিয়ে। মাটি কেমন নাচছে তার নুপুরের ঝুম শব্দে।

আবু ওয়ালেদ পরম আনন্দে পুলকিত হয়।  ধীরে ধীরে হাতের লাঠিতে ভর করে উঠে আসে জাবালে রাআদের চূড়ায়। এখানে বাতাসের প্রচণ্ড বেগ। যেন চারপাশে সমস্ত পাহাড়গুলো আমূল উপড়ে নেবে এককটি বাতাসের স্রোত।

আবু ওয়ালেদ সেখানে সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। হাতের লাঠিটি শক্ত করে ধরে শপথ করে, আমার বোনকে আমি হারজার সবচে কুলীন ঘরে বিয়ে দেব। বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে ওর সন্তানেরা। সভ্য,মার্জিত ও দানবীর হবে। শিক্ষা ও আতিথেয়তায় তারা হবে মশহুর। হ্যাঁ- রাফেয়াকে তেমন ঘরেই বিয়ে দেব।

আবু ওয়ালেদ এখন ষাটের অশীতিপর। গোত্রীয় প্রথা অনুযায়ী হাতের লাঠিটা এখনো মজবুত। হাড়ের মতোই শক্ত ও কয়েক যুগের পুরনো। লম্বা তোপ ও মাথায় কুফেইয়া পেঁচিয়ে সে চলছে। সঙ্গে একমাত্র ছেলে ওয়ালেদ। বয়স ছাব্বিশ।

পিতার পঠিত ধর্মীয় গ্রন্থ, হুক্কা ও বনু আকীকের দেয়া খেজুরগুলো নিয়ে পেছনে পেছনে হাঁটছে সে। ওয়ালেদ পরিণত যুবক। পিতার ব্যবসায় নিজের কর্মদক্ষতা ও চৌকসতার প্রমাণ রেখেছে সে। বন্ধু ও প্রতিবেশী যুবকদের মাঝে বুদ্ধিমান হিসেবেই বিবেচিত। পুরুষ্টু পেশী ও উন্মুক্ত সিনার ওয়ালেদ তীর নিক্ষেপ ও অশ্ব চালনায় রেখেছে পারঙ্গমতার ছাপ।

তবে বাবা কখনোই তার এসব সাফল্য ও অন্যান্য যুবকদের চেয়ে গুণধর ছেলেকে অতি উচ্ছাস দেখাননি। নিয়ে যাননি কোন দীর্ঘ সফর বা অতিদূর দেশের কোনো বৃদ্ধ জ্ঞানীর সভায়। আজ এই প্রথম ওয়ালেদ তার পিতার সঙ্গে রওয়ানা হয়েছে তার পূর্বপুরুষের দেশে। শুনেছে সেখানে জ্ঞানী, যাজক, কবি ও ধর্মবেত্তাদের আখড়া।

তারা পৃথিবীর নানাবিধ কার্যকলাপ, সমাজ ও রাষ্ট্রের শুদ্ধি -অশুদ্ধির ব্যাপারে তর্ক করে। এদের ভেতর কেবল কবিরাই আলাদা। তারা সূরা ও শরবতের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে চাঁদ ও সূর্যের জন্মপত্র নির্ণয় করে। তাদের সঙ্গে অন্যদের সখ্যতা নেই তেমন। কিন্তু তারা তাদের পাপ ও পূণ্যকে স্পষ্ট করে দেয়।

কবিদের মধ্যে যারা নগ্ন ও নষ্ট তারা তাদের নষ্টতা প্রকাশে দ্বিধাহীন।  যারা সত্য ও পবিত্র তারা তাদের সত্য প্রকাশে নিঃসঙ্কোচ, বলিষ্ঠ।

ওয়ালেদ সেসব দেবস্ব পুরুষদের সাক্ষাতে বড় ব্যাকুল। তার চঞ্চল মন বারবারই লাগামহীন হয়ে তাকে তাড়না দিচ্ছে  পিতার কাছে তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে৷ গল্প করতে। কিন্তু ভয় ও উৎকন্ঠায় তার ঠোঁট একটিবারও কথা বলেনি। উচ্চারণ করেনি কোনো শব্দ।

দীর্ঘ তিন রাত পর হঠাৎ আবু ওয়ালেদ কথা বললেন। ভরাট গম্ভীর অথচ নরম কণ্ঠে ছেলেকে বলেন, দ্যাখো! আমি তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা করেছি। ছাব্বিশ বছরের তোজোদ্দীপ্ত জোয়ান ও শক্ত পেশীর তুমি কতোটা অচঞ্চল হতে পারো, আমি তাই নিরীক্ষণ করেছি। তোমার স্থির ও অপ্রশ্ন অনুসরণ আমাকে আশান্বিত করেছে।

‘তোমার ধৈর্য ও নিরবচ্ছিন্ন সফরের  সহ্যক্ষমতা আমাকে নিশ্চিন্ত করেছে। এই পবিত্র গ্রন্থ যা আমি এতোকাল পাঠ করে এসেছি, আমার বিশ্বাস তুমি তার ভার বইতে পারবে। তুমি সেভাবেই তৈরি হয়েছ।’
ওয়ালেদ!
আদেশ করুন পিতা!
আমরা আর দুই প্রহর পর এমন এক ভূমি অতিক্রম করব, যেখানে তুমি একজন যাজক ও একজন ধর্মবেত্তার সাক্ষাত পাবে। আমি তাদের সঙ্গে যেসব বিষয়ে আলাপ করব তুমি তা মন দিয়ে শুনবে ও লিপিবদ্ধ করবে।
অবশ্যই পিতা।
শোনো!
জ্বি, পিতা।
তোমার কি এ দীর্ঘ যাত্রায়   কষ্ট হচ্ছে?
জি না পিতা।
হচ্ছে,আমি জানি। কষ্ট ও ব্যথা আদম সন্তানের সহজাত বিষয়। কিন্তু এসব পার্থিব বিষয়কে উপলব্ধি করে এর ভেতরই যদি তুমি অন্যান্য মানব সন্তানদের শান্তি কামনা করো, তাহলে এসমস্ত জরা ও মুহূর্তকালীন কষ্ট তোমাকে আক্রান্ত করতে পারবে না।

তবে শোনো! অধিকাংশ মানবই অকৃতজ্ঞ ও তোমার শত্রু হবে। তাদের মার্জনা করে তাদের শান্তি ও কল্যাণের ব্রতই যদি তুমি গ্রহণ করতে পারো, তাহলে এই সূর্য ও ঘন কণ্টকাকীর্ণ বাবলা গাছের প্রতিটি কাঁটাও তোমাকে তোমার মৃত্যুর পর স্মরণ করবে।

‘তুমি হবে সেসব সাধুপুরুষদের অন্তর্ভূক্ত, যারা তাদের মৃত্যুর পর বিভিন্ন ধর্মে  বিভিন্ন নামে উচ্চারিত হয়েছেন। এই হলো তোমার প্রতি আমার প্রথম উপদেশ। পুরো যাত্রাপথে আমি তোমাকে এমন তিনটি উপদেশ দেব।’

‘চলো এখন আমরা বনু আকীকের উপহার দেয়া খেজুর খেয়ে নিই আর তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আল্লাহ তাদের খেজুর বাগানে স্বর্গীয় প্রাচুর্য দান করুন।’

দুই
দিগন্ত ছেড়া ধূধূ মরুভূমি। কোথায় এর শেষ, কোথায়ই বা শুরু! ঠাহর করা মুশকিল। অবিশ্রান্তভাবে হেঁটে চলেছেন একজন অভিজ্ঞ বৃদ্ধ পুরুষ আর তার যুবা ছেলে। 

এই সফরের গূঢ় উদ্দেশ্য কী! তা কি কেবলই পূর্বপুরুষের দেশে যাওয়া, নাকি ভিন্ন কিছুর জন্যই পিতা এ দীর্ঘ সফর করছেন। ক্রমাগত প্রশ্নটি উঁকি দিচ্ছিল ওয়ালেদের মনে। সে ভাবে আর উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে মাঝেমাঝেই। যেন কোন তপস্যার খোঁজে তারা বেরিয়েছে। পেছনে রাখছে তাদের স্বাভাবিক জীবন ও প্রত্যহ চাহিদার সমস্ত বায়বীয়তা।

ক্রমশ তারা প্রবেশ করছে কোনো এক অনন্তলোকের পথে। যেখানে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে দেবদূতদের সেসব কথা। যা তারা হাজার বছর ধরে সংরক্ষণ করে রেখেছে মুখেমুখে। শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে উপত্যকা বা বেলাভূমে আসর বসেছে সেসব দৈববাণীর।

যাদের ভাগ্য ভালো তারাই কেবল সেসব  ঐশ্বরিক আদেশের গীতলতা অনুভব করেছে। আর নিভৃতে বসে পড়েছে একটি ধ্যানমগ্ন শরীরের ভেতর।

সান্ধ্য আকাশে কিছু মেঘ অস্থির ছুটোছুটি করছে বুঝি। যেন সামনের আকাশস্পর্শী পাহাড়ে ঠেকে ঠেকে গড়িয়ে পড়ছে ওপাশে। এমন দৃশ্যে নিস্পলক চেয়ে থাকে ওয়ালেদ।

পিতা তাকে ডাক দেয় এবং সেই ধীরস্থির অনুত্তাপ কণ্ঠে বলে, আমরা রাতটা এই পাহাড়ের গুহায় কাটাব। সেখানে তুমি সেই দুই পুরুষের সাক্ষাত পাবে। যাদের কথা ইতোপূর্বে আমি তোমাকে বলেছি। তাদের সঙ্গে আমার আলাপ ও রাত্রিকালীন কথোপকথন লিখে সংরক্ষণ করো। যা তোমাকে আমার মৃত্যুর পর তোমার চারপাশের পৃথিবীকে পড়তে সাহায্য করবে। 

ওয়ালেদ একমনে পিতার কথা শুনছিল। শেষ হলে পিতার ডান হাতের পিঠে চুম্বন করে আশীর্বাদ ও কল্যাণের প্রার্থনা করে। এরপর তারা উভয়েই প্রবেশ করে এই অন্ধকার পাহাড়ের গুহায়।

লম্বা তোপ ও গোতরাবৃত দুই থুত্থুরে বুড়ো। ধবধবে শশ্রুমণ্ডিত ও উজ্জ্বল চোখ। বার্ধক্যে নুয়ে পড়েছে চোখের ভ্রু। তারা উভয়েই শান্ত ও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আগুনের তা নিচ্ছে। পাশেই পড়ে আছে কিছু টুকরো টুকরো কাগজের নুসখা। তাতে হিজিবিজি কেমন দাগকাটা । মনে হয় কোন মন্ত্র বা জাদুর নকশা।

ওয়ালেদ আর তার পিতা তাদের পেছনে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ যেতেই তারা উভয়ে মাথা ঘুরিয়ে সম্বোধন করে, আবু ওয়ালেদ! স্বাগতম তোমায়। এসো! আর কিছুকালের জন্য পঙ্কিল পৃথিবীর অন্ধকার ছেড়ে নিঃশ্বাস নাও স্বর্গের। মানুষ থাকাকালে তোমরা যেমন নিঃশ্বাস নিতে। যেমন নিঃশ্বাস নিয়েছে তোমাদের পবিত্র আদিপিতারা।

‘এসো হে আবু ওয়ালেদ! আর ওয়ালেদ তুমিও গ্রহণ করো আমাদের এই বৃদ্ধদের নৈশকালীন আলাপচারিতা। যা তোমাকে ঋদ্ধ করবে। তোমার ভবিষ্যত ও আগত দিনকে করবে সমুজ্জ্বল ও সুষমাময়।’

আবু ওয়ালেদ! তুমি কি আমাদের বনু আকিকের খেজুর খেতে দিবে? তাদের বাগানগুলো বড় সুন্দর ও গাছগুলো অতিশয় ফলবতী। খোদা তাদের প্রাচুর্যে ভরে দিক।

হ্যাঁ। অবশ্যই!  আবু যুরআ ও ইবনুল আমিন। আপনারা খেয়ে আমাকে তৃপ্ত করুন। আকিক গোত্রের খেজুরগুলো সত্যিই সুমিষ্ট ও মাংসল। 
আবু ওয়ালেদ থলে থেকে তাদের খেজুর বের করে দেন। দুই বৃদ্ধ তা গ্রহণ করেন এবং খেয়ে দোয়া করেন, তোমার ও তোমার পুত্রের মঙ্গল হোক আবু ওয়ালেদ।

আবু ওয়ালেদ ও তার ছেলেসহ সমস্বরে চারজন তিন প্রজন্মের পুরুষ বলে ওঠে, আমেন।

রাত কিছুটা গভীর হতেই গুহাটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কোথা থেকে আসছে এই আলো। এই আঁধার রাতে পাহাড়ের অন্ধকার গুহায় কে বা জ্বেলে দিল এই আলোকের বিভা।

ওয়ালেদ একটি ঘোর মোহাচ্ছন্নতার ভেতরে ডুবে খুঁজতে থাকে এর কারণ। অনেকক্ষণ পর তার চৈতন্য আসে। আর তার মনে হয় এই দ্যুতি ছড়াচ্ছে আবু যুরআ ও ইবনুল আমিরের সমস্ত অঙ্গ থেকে। তারা হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। আর তার পিতা তা একধ্যানে শুনছে। কখনো চোখ তুলে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করছে।

আচ্ছা আবু যুরআ আপনি বলুন - আমাদের প্রকৃত আনন্দ ও অপার্থিব জীবনের সফলতা কিসে?

স্মিত হেসে আবু যুরআ উত্তর দেয়, যে জীবন তুমি ক্ষয় করলে তার কোথায় তুমি সমস্ত সৃষ্টির কল্যাণী ছিলে সেখানেই প্রকৃত আনন্দ। এছাড়া বাকিসব তুচ্ছ ও নিরানন্দ। আপন সুখ ও বিলাসিতার ভেতর কেবলই অপ্রাপ্তি। আর আমাদের অপার্থিব সফলতা হচ্ছে আমাদের অন্তরের বিধৌততা। যে যত পবিত্র ও শুদ্ধ তার অপার্থিবকাল ততটাই সহজ ও সফল। 

হে ইবনুল আমির! আমাকে বলুন, পৃথিবীতে এই যে সংঘাত ও রক্তের বিস্তৃত দীঘি এর কারণ কী?

এ বড় শক্ত কথা আবু ওয়ালেদ! শোনো, মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও প্রেমের সুতোয় যেদিন টান পড়েছে, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে সংঘাতকাল। এই সূর্য ও মাটি পৃথিবীর সবার। বাতাস ও জলের কোনো মালিক নেই এক ঈশ্বর ছাড়া। তিনি তো তা ভাগ করে দেননি। মানুষই তা ভাগ করেছে এবং অসত্য ও মিথ্যাকে বানিয়ে নিয়েছে আশ্রয়। তাই এই অশুভকাল নিপতিত হয়েছে তাদের উপর।

ধর্মবেত্তাদের ব্যাপারে কিছু বলুন হে পবিত্র পুরুষগণ!

আমরা তো নগন্য সেবকমাত্র হে আবু ওয়ালেদ! তবুও শোনো, পয়গম্বর তথা আল্লাহর বার্তাবাহকরা পৃথিবীতে যেসব দৈববাণী বলে গিয়েছেন মানুষের মাঝে তা পৌঁছার তারা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একভাগ সত্য ও ধর্মের উদারতার কথা বলে, আরেকভাগ নিজেদের স্বার্থ ও গোয়ার্তুমিবশত সত্যকে লুকিয়ে রাখে।

‘অথচ তারা চিৎকার করে বলে আমরাই সত্যজন। আমাদের কথা শোনো আর আমাদের পথে চলো। মূলত তারাই আলোর বদলে আরো বেশী আঁধারের আমন্ত্রণ করে। অথচ কত উত্তম ও সুন্দর ধর্মের সেসমস্ত পবিত্র বাণী। যা খোদা সময়ে সময়ে তার বার্তাবাহকদের দ্বারা মানুষের জন্য বিধৃত করেছেন।’

আপনাদের উপর আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক হে চন্দ্রপুকুরগণ! আপনাদের আলো বিচ্ছুরিত হোক পৃথিবীর উপত্যকায় উপত্যকায়। আমরা আপনাদের মতো সত্য জ্ঞানীদের তালাশে বের হবই। 

তোমার  পুত্রের জন্যও রইলো মেঘপুঞ্জের শুভ্রতা ও অনন্তকালের সৌরভময়তা।

তিন
ক্রমশ গুহার চারদিকে এক অপূর্ব জ্যোতির্ময়তা ধীরে ধীরে পরিব্যপ্ত হচ্ছে আর গুহাটি একটি সাদা ধবধবে আলোকোজ্জ্বল দিনে রূপান্তরিত হচ্ছে। ওয়ালেদ পিতার আস্তিন ধরে নির্জীব বিভজনীয়তায় হারিয়ে যাচ্ছে।

ইবনুল আমির শীতলস্বরে বলে, আবু ওয়ালেদ! আমাদের বুঝি কথার চাদরকে গুটিয়ে আনার সময় হলো। ভোর আসন্ন। একটি সুন্দর ও পবিত্র দিন অপেক্ষা করছে তোমার ও তোমার পুত্রের জন্য। আমরা বিদায় নিতে চাই। তোমার সঙ্গে বোধকরি এটাই আমাদের শেষ দেখা।

‘আগামী প্রত্যুষেই আমরা অনন্তলোকের পথে হাঁটব। এই জ্বরাগ্রস্ত পৃথিবী ও বিক্ষুব্ধ মানব সম্প্রদায় অহিংস ও প্রেমময় হয়ে ওঠুক, আমরা সেই প্রার্থনাই করছি। আমরা মানবের এই সুন্দর পৃথিবীটাকে একটি হৃদয়ের মতো দেখতে চাই। চারপাশে সবুজ ছায়াবীথি বন। সকল মানুষ সেখানে ফুল তুলতে আসবে। আমাদের বিদায় দাও আবু ওয়ালেদ!’

আবু ওয়ালেদ বিষন্ন অথচ শান্ত অচঞ্চল হয়ে ঠায় বসে রয় কিছুক্ষণ। তারপর নীরবতা ভেঙে বলে, আমিও আপনাদের সঙ্গে যেতে চাই হে সত্যাশ্রয়ী পবিত্র দুই মানব।

‘আমি আমার সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে সমর্থ হয়েছি, তবে কেবল একটি ছাড়া। হয়তো মানুষ বলেই এ অপূর্ণতা আমার রয়ে গেছে। তবে সেটিও পূর্ণ করার ব্যবস্থা আমি করে যেতে পারব।’

বৃদ্ধদ্বয় ক্ষণকাল চুপ থেকে বলেন, কেউ অনন্তলোকের পথে যাবার ইচ্ছে করলে তাকে বাঁধা দেবার সাধ্যি কার! তাহলে তুমিও এসো। তোমার এ পথ মসৃণ হোক। যাও শেষবার পুত্রের সঙ্গে তোমার আহরিত জ্ঞান ও উপদেশ ভাগ করে এসো। তাকে পরিপূর্ণ করে দাও। দান করো তোমার পঠিত পবিত্রগ্রন্থ।

আবু ওয়ালেদ তার পুত্রের মুখোমুখি বসে। স্থির নতজানু হয়ে আছে পুত্র  ওয়ালেদ। পিতা তার সমস্ত আবেগ ও ভালোবাসা একত্র করে তার কপালে চুমু খায়।

তারপর কঠোর ও তেজস্বী হয়ে ওয়ালেদের বাম তর্জনী ধরে বলেন, পুত্র!  তোমাকে এই ঘোর ও অভূতপূর্ব সফরের শুরুতে একটি উপদেশ দেবার পর বলেছিলাম পুরো সফরে তিনটি উপদেশ দেব। সেই তিনটি উপদেশ তাই, আবু যুরআ ও ইবনুল আমির আমাকে যা বলেছেন।

‘দ্বিতীয়ত তোমাকে বলেছিলাম আমার পূর্বপুরুষ তথা তোমার পিতামহ প্রপ্রতিমহের দেশের কথা। সেখানে কবি ও যাজকদের সঙ্গে তোমার সাক্ষাত ঘটবে। ভেবেছিলাম আমি থাকব সেখানে। কিন্তু না, তা হচ্ছে না। কাল প্রত্যুষেই এই দুই পবিত্র পুরুষের সঙ্গে আমিও অনন্তলোকের পথে সফর ধরব।’

‘তবে আমি মোটেও বিচলিত নই। কারণ তোমাকে আমি আমার এ লাঠি ও পবিত্রগ্রন্থ দিয়ে যাচ্ছি। যা দিয়ে তুমি সেসব সাধুপুরুষদের সাক্ষাতে যাবে। এদুটো জিনিস দেখলেই তারা তোমাকে চিনে নেবে আর দেখিয়ে দেবে তোমার ফুফু রাফেয়ার  কবর।‘

‘আমার ছোট্ট বোন রাফেয়ার সমাধিসৌধ। সেই দুপুরেই পাহাড় থেকে নেমে এসে আমি দেখেছিলাম আমার বোনটি মারা গেছে। তুমি তার কবরের পাশে এই পবিত্র গ্রন্থ থেকে কিছু স্তবক ও কয়েকটি  পৃষ্ঠা পাঠ করো…’

এসএস

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত