শিরোনাম

২৫ বছর পর ধান চাষে ফিরছে বাগেরহাটের ১৭ হাজার চাষী

এস.এস শোহান, বাগেরহাট  |  ১৩:১২, নভেম্বর ০৭, ২০১৮

বাগেরহাটে ২৫ বছর পরে অনাবাদী জমিতে ধান ও সবজি চাষে ফিরছে ১৭ হাজার চাষী। বেড়িবাধের ফলে লবনাক্ত পানি ঢোকা বন্ধ হওয়ায় এ সুবিধা পাচ্ছেন চাষীরা। জেলার মোরেলগঞ্জ ও রামপাল উপজেলার বেশিরভাগ এলাকায় লবনাক্ত পানি প্রবেশ করায় সবজি ও ধান চাষ করতে পারত না জমির মালিকরা। নিজের জমি থাকা স্বত্ত্বেও ফসল না হওয়ায় দুঃখ দুর্দশায় দিন কাটত এ অঞ্চলের চাষীদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাধ নির্মাণ ও শাখা খাল বন্ধ করে স্লুইজ গেট দেয়ার কারণে কৃষি জমিতে ও লোকালয়ে লবন পানি ঢোকা বন্ধ হওয়ায় অনাবাদী জমিতে ধান চাষ করে হাসি ফুটেছে চাষীদের মুখে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জেলার মোংলা উপজেলায় কিচু অঞ্চলে বেড়ি বাধ দিলে ঐসব এলাকার নাবাদী জমিও চাষ করতে পারত চাষীরা।

সরজমিনে মোরেলগঞ্জ উপজেলার পঞ্চকরণ ইউনিয়নের খারুইখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সবুজে বিস্তীর্ণ এলাকা শুধু সবুজ আর সবুজ। এলাকার মাঠ-ঘাট, বাড়ির আঙ্গিনা ও রাস্তার পাশ সব জায়গা ভরে আছে লাউ, কুমড়া, মুলা, মরিচের চাড়াসহ বিভিন্ন সবজিতে। মাঠজুড়ে রয়েছে সবুজ ধানের সমারোহ।

সেখানে কথা হয় কৃষক ইউনুস আহমদ (৬০) এর সাথে তিনি বলেন, লবনাক্ততার কারণে ২০-২৫ ধরে ঘরে ধান তুলতে পারিনি। গত দু-বছর ধরে শুধু ধান নয় রবিশস্য মৌসুমে লাউ, কুমড়া, লাল শাকসহ নানা সবজি চাষ করতে পারছি। বাড়ি ও মাঠের কোন জায়গা পরে থাকছেনা। সব জায়গাতেই কোন না কোন ফসল হচ্ছে। একটা সময় আমাদের এলাকায় আম গাছ হত না। বর্তমানে গাছ লাগালেই ফল ধরে। লবনাক্ততার কবল থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা খুশি হয়েছি।

পঞ্চকরণ গ্রামের কৃষক জালাল শরীফ বলেন, ২৫ বছর আগে ৫২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে ১২ থেকে ১৩‘শ মন ধান পেতাম। এরপর বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রভাবশালীরা বেড়ি বাধ কেটে লবন পানি ঢুকিয়ে এলাকার জমিগুলোকে ফসল চাষের অযোগ্য করে তোলে। লবন পানি ঢুকানোর পরেও আমরা ধান চাষের চেষ্টা করেছি। কিন্তু তখন ১২‘শ মনের জায়গায় ৩০-৪০ মন ধানও পেতাম। এর পরে একসময় ধান চাষ বন্ধ করে দেই। এখন লবন পানি না ঢোকায় বছর দুয়েক হল আমরা ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ শুরু করেছি। হাসি ফুটেছে এলাকার মানুষের মুখে।

অপর এক কৃষক ফেরদাউস মুন্সি বলেন, চিংড়ি চাষে বিভিন্ন রোগের কারণে মার খেয়েছি। ধানতো হতই না। বাড়ির গাছপালা গুলোও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের এলাকার এ চিংড়ি চাষ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে। যার ফলে প্রান্তিক চাষীরা নানা কষ্টে থাকত। কারণ তাদেরকে জমি বাবদ নামমাত্র হাড়ির টাকা দেয়া হত। তাতে তাদের সংসার চলত না। বর্তমানে নিজ নিজ জমিতে ফসল ফলিয়ে সংসার চালিয়েও বছর শেষে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারছে চাষীরা।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে বেশি লবনাক্ত তেলিগাতি, পুটিখালী, পঞ্চকরণ, বৈজ্ঞহাটি ও জিউধরা ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে নতুনভাবে সাড়ে ৭ হাজার চাষী ধাণ চাষ করছেন। এছাড়া রামপাল উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে ১০ হাজার চাষী ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করছে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপম রায় বলেন, মোরেলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে বেড়িবাধ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে লবন পানি প্রবেশের কারণে ঐ এলাকায় ধানসহ তেমন কোন ফসল হত না। গত তিন বছর ধরে লবন পানি প্রবেশ না করার ফলে ঐ এলাকার চাষীরা ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ করছেন। আমরা তাদেরকে নতুন প্রযুক্তি সহায়তার মাধ্যমে চাষাবাদে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলছি। গত ৩ বছরে বোরো মৌসুমে ২ হাজার হেক্টর অনাবাদী জমিতে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করেছে চাষীরা। এছাড়া টমেটো, মরিচ, করল্লাসহ বিভিন্ন ধরণের মৌসুমি সবজির আবাদ করছেন তারা।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ আফতাব উদ্দিন বলেন, মোরেলগঞ্জ ও রামপালে সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর অনাবাদি জমিতে বোরো চাষ শুরু করেছে কৃষকরা। লবন পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ায় দিন দিন এ এলাকায় চাষাবাদের জমি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত